ক্যাপিটালিজমের দিন শেষ ?

মাকছুদুর রহমান তুহিন : আগামির দুনিয়ায় সম্ভাব্য যেই ইকোনমিক স্ট্রাকচার আমাদের উপরে নিপতিত হইতে যাইতেছে, তার নাম টেকনোফিউডালিজম। যারা ইলন মাস্ক, মেনসিয়াস মোল্ডবাগ ওরফে কার্টিস ইয়ারভিনের উদ্ভট আলাপের সাথে পরিচিত আছেন, তারা আজকের আলাপটা বুঝবেন।
গত প্রায় এক যুগ ‘ফ্রি’ সোশাল-মিডিয়া অর্থাৎ ফেইসবুক টিকটক এক্স ইনস্টা ডিসকর্ড ইউটিউব স্পটিফাই গুগোল এবং বর্তমানে চ্যাটজিপিটি ওপেনএআই ডিপসিক সেবার মাধ্যমে টেক-জায়ান্টরা আমাদের মনের সকল প্রকার তথ্য সংগ্রহ করছেন। এইবার তারা এ্যাপলের মতো একটা টেক-কোম্পানি স্টাইলে রাষ্ট্র চালানোর কথা ভাবতেছেন। তারা বলতেছেন জনসাধারণ সব মূর্খ। তারা বলতেছেন এইসব মূর্খ জনগণের কাছ থেকে ভোট নিয়া রাষ্ট্র শাসনের কিছু নাই (এই আলাপ অবশ্য সক্রেটিসের)। বরং আগের দিনে সামন্ত যুগে যেইভাবে রাষ্ট্র শাসন পড়ালেখা ইত্যাদি ছিলো শুধুমাত্র একটা গোষ্ঠীর হাতে, আর বাদবাকি জনগণের দিন গেছে কামলা খাইটা, এখন তা আবার ফিরিয়ে আনা উচিত।
বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ মূর্খ কিংবা রাজনৈতিকভাবে অসচেতন। তথাপিও পলিটিকালি এই চিন্তা রেসিস্ট এবং অত্যন্ত ভয়ংকর। গণতন্ত্রে প্রচুর সমস্যা আছে অবশ্যই, কিন্তু গণতন্ত্রের বিরোধিতা কইরা দুনিয়াতে ডিক্টেটরশিপ টেনে এনে একটা শ্রেণিরে সকল পদ্ধতিতে নিপীড়ণরে সমর্থন জানানো যায় না। অবশ্য গণতন্ত্রও সেই কাজ করে, কোভার্টলি। কিন্তু গণতন্ত্রের একটা সুবিধা আছে, সেইটা হইলো একজন মানুষের অনেকক্ষেত্রেই ডিক্লাস হওয়ার সুবিধা থাকে, অর্থাৎ একজন রিক্সাওয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা কইরা টাকাপয়সা কামিয়ে ঢাকায় তিনতলা বাড়ি বানিয়ে নিজের অর্থনৈতিক এবং সেই সূত্রে সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু সামন্তবাদে সেই সুযোগ নাই। সামন্তবাদে আপনি ফইন্নি হইলে সারাজীবনই ফইন্নি। আপনার পোলাপান ফইন্নি। এবং আপনার নাতি-নাতনিও ফইন্নি।
ক্যাপিটালিজম আমাদের অলরেডি ক্যাপিটালিজমপ্রসূত ডিস্টোপিয়া দেখায়ে ফেলছে। ইলন মাস্কের মতো একজন মাত্র ব্যক্তিরে পৃথিবীর বাদবাকি আট বিলিয়ন মানুষের চাইতে ক্ষমতাধর বানায়ে তারে দিয়া নির্লজ্জভাবে প্রকাশ্যে ইওরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনীতিও নির্ধারণ করাইতেছে।
আপনাদের জানা থাকতে পারে যে জার্মানির নিও-নাৎসি পার্টি এএফডিরে মাস্ক এখন প্রকাশ্যে সমর্থন জানাইতেছেন।
সুতরাং এই মূহুর্তেই ডিসেন্ট্রালাইজড ইকোনমির দিকে না আগাইলে এই টেকনোফিউডালিজম ঠেকানোর রাস্তা নাই। আরেকটা আশা আছে চায়নার তরফ থেকে। আমেরিকান সাম্রাজ্যের যে পতন হইতে যাইতেছে কিছুদিনের মধ্যে, তা দুনিয়ার প্রচুর ইকোনমিস্ট অনেকদিন আগেই প্রেডিক্ট কইরা গেছেন। সুতরাং ব্রিক্স অথবা ক্রিপ্টো এবং চায়নার মাধ্যমে ডলারের দর পতন করা গেলেই হয়তো এই টেকনোফিউডালিজম এড়ানো যাবে। মনে রাখবেন মার্কিসিস্ট ইকোনোমিতেও বিশ্ব আর কখনোই ফিরে যাবেনা।
তবে ইলন মাস্কদের মতো মূর্খ বিলিয়নেয়ারদের এই যাত্রা যদি হালে পানি নাও পায় ধারণা করি আমাদের টেকনোলজিকাল ডিস্টোপিয়ার মাত্র শুরু।
এবং এই ডিস্টোপিয়ার প্রথম বলি হবেন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা আর্টিফিশিয়াল সুপার ইনটেলিজেন্স দিয়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য একটা মাত্র কাজ জানা, শারীরিক শ্রম নির্ভর পেশার এবং কেরানির কাজ করা, বিক্রির কাজ করা, ডেটাএন্ট্রি কাস্টমার সার্ভিসে কাজ করা এমনকি ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার বিচারকরাও। ফলতঃ আমরা যেইদিকেই যাই, একইসাথে পাঁচটা বিষয়ে নিজেরে এক্সপার্ট না বানাইতে পারলে, বিশেষতঃ নিজের এলাকার পাশাপাশি মেশিন-লার্নিং এআই প্রোগ্রামিং বিগডেটা ইত্যাদি সম্পর্কে না জানলে আমরা নিজেরাই নিজেদের, এবং নিজেদের পরের প্রজন্মের নির্যাতনের রাস্তা প্রশস্ত করে দিবো।
প্রভাষক
ইংরেজি
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল মহাবিদ্যালয়
আলিনগর, ভোলা সদর, ভোলা।
