বই পড়া-বই মেলা এবং প্রাসঙ্গিক কিছুকথা

সাহিত্য ও সংস্কৃতি মনা যে কান বাংলাদেশীদের কাছে বই মেলা একটা আবেগ ও প্রেরণার স্থান। অনেকেই আছেন যারা বই মেলা শুরু হওয়ার আগ থেকেই মেলা মাঠে ঘুরে আসেন। পাঠক বলতে পারেন, যারা স্টল দিয়েছেন তারাতো প্রস্তুতির কাজ তদারকি করতে যাবেনই। কিন্তু অনেক বই প্রেমী বা মেলা প্রেমীদের যাতায়াত হয় মেলা শুরু হওয়ার আগ থেকেই ।
আমি বই মেলায় যাই আশির দশকের শুরু থেকেই। তখন বাংলা একাডেমির চত্বরে স্বল্প সংখ্যক স্টল থাকতো। আর বাংলা একাডেমির বাহিরে রাস্তার দু’পাশে ফুটপাতে বইর পসরা বসতো। সাথে বসতো ফিতা চুড়ির দোকান, মুড়কি মোয়ার দোকান, সহ নানান মুখরোচক খাবারের দোকান। সেই দোকানগুলো দক্ষিনে দোয়েল চত্ত্বর এবং উত্তরে জাতীয় যাদুঘর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকতো।
ছোটবেলা থেকে বই পড়ার একটা বাজে অভ্যাস। যা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। প্রথম বই পড়া শুরু করি রোমেনা আফাজের ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ দিয়ে। তখন আমি খুবই ছোট। এরপর সেবা প্রকাশনী সহ ভারতের বিমল, আশুতোষ, নিমাই, নিহারঞ্জন প্রমুখের লেখা বই। ধীর ধীরে শরৎ, বঙ্কিম, সুনীল, সমরেশদের মোটা উপন্যাস সহ নানান বিষয় ভিত্তিক বই।
উল্লেখ্য আমি ১৯৭২ সাল থেকে তৎকালীন সোভিয়েত কালচারাল সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত- ‘উদয়ন’ ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়েছিলাম। ১৯৭৩ সালে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারে পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখি সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কিত সমস্ত মুদ্রিত পোস্টার, লিফলেট, পুস্তিকা, ম্যাপ ইত্যাদি পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে। এক লাইন লিখিছিলাম কমিউনিজম সম্পর্কিত কোন পুস্তিকা পাঠানো যায় কিনা?
দশ দিনের মাথার আমার প্রয়াত শিক্ষক পিতার ভোলা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রযতেœ প্রায় ১৫ কেজি ওজনের বিশাল একটি প্যাকেট আমার নামে পাটিয়ে দেন সোভিয়েত কালচারাল সেন্টার।
আমি সেসময় এক বিকেলে গ্রামের বাড়ির কাঠের দোতলার ঘরের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আব্বা স্কুল ছুটির অনেক পরে রিক্সায় করে বাড়ি ফিরলেন। পায়ের কাছে বিশাল একটি প্যাকেট। আমায় ইশারায় ডাকলেন। আমি দৌড়ে নিচে গিয়ে রিক্সার কাছে গেলাম। আব্বা প্যাকেট দেখিয়ে বললেন- এটা তোমার। ঐ বয়সে প্যাকেট তুলে ঘরে আনতে আমার খানিকটা কষ্টই হয়েছিল। নিচতলার আমার নির্ধারিত রুমে নিয়ে যাই। আব্বা চলে যান দোতলায়। আমি তাড়াহুড়ো করে প্যাকেট খুলি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাই। কাঙ্ক্ষিত সব কিছুই পাঠিয়েছে। উপরন্তু কমিউনিজমের উপর অনেকগুলো বই পাঠিয়েছিলো।
সন্ধ্যার পর আব্বার ডাক পেয়ে দোতলায় গেলাম। আব্বা জিজ্ঞেস করেছিলেন: প্যাকেটে কি ছিলো ? সোভিয়েত ইউনিয়নে সকল প্রদেশের মানচিত্র, লিফলেট, বুকলেট ইত্যাদি- উত্তরে জানালাম। আবার জিজ্ঞেস করলেন- আর ? এবার সত্যটাই বলতে হলো। কমিউনিজমের উপর বেশ কিছু বই। সেগুলো কি করেছো ? আপনার ভয়ে তোষকের নিচে বিছিয়ে লুকিয়ে রেখেছি আপনার ভয়ে। (আব্বা ১৯৫৫ সালের গ্রাজুয়েট হলেও চলনে বলনে, পোশাকে আসাকে পাক্কা মুসল্লী ছিলেন)। আমার কথা শুনে হেঁসে দিয়ে আব্বা বললেন- ‘লুকালে কেন? নিয়ে এসো। দু’জনে ভাগাভাগি করে পড়বো। তারপর দুজনে মিলে আলোচনা করবো।’
সেই দিনের সেই প্রশ্রয় পেয়ে বই পড়াটা যেন নেশায় পরিনত হয়ে গেলো। ১৯৮২ সালের কোন এক অলস দুপুরে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ৩১০ নাম্বার রুমে থাকি। এক বন্ধু এসে জানালেন বাংলা একাডেমির বই মেলার বটতলায় লেখক নিমাই ভট্রাচার্য একাকী বসে আছেন। শুনেই কাপড় পরিবর্তন করে দৌড়ে চলে গেলাম। নমস্কার দিয়ে জানালাম দাদা আমি আপনার লেখার ভক্ত পাঠক। শুনে খুবই খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন তাঁর লেখা কোন কোন বই পড়েছি ? জানালাম- মেমসাহেব,অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, পেনফ্রেন্ড ক্লাসফ্রেন্ড, রাইটার্স বিল্ডিং ইত্যাদি।
মেমসাহেব বইটির মুল চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতে বললেন। যথারীতি আলোচনা করলাম সাধ্যানুযায়ী। শুনে দাঁড়িয়ে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। বললেন- আজ আমি আপনাকে খাওয়াবো। জেনে নিলাম এবছর তাঁর লেখা প্রকাশিত বইটির নাম। ‘মাতাল’। একটি স্টল থেকে দৌড়ে গিয়ে কিনে আনলাম। উনি চমৎকার করে অটোগ্রাফ লিখে দিলেন। দুর্ভাগ্য আমার, বইটি হারিয়ে ফেলেছি।
সেদিন আরো কিনেছিলাম মৈত্রী দেবীর ‘ন হন্যতে’, মির্চা এলিয়াদের ‘লানুই বেঙ্গলী’, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এর ‘ওহফরধহ রিহং ঋৎববফড়স’, ডি এইচ লরেন্সের ‘লেডী চ্যাটার্লিজ লাভার’। এবার প্রথম দিনই অনুজ কবি তাহমিনা শিল্পী সহ গোধূলি লগনে বই মেলায় গিয়েছিলাম। মঈন মুরসালিনের প্রভাতী প্রকাশনীতে প্রারম্ভিক পদচারনা দিয়ে শুরু। তাহমিনা শিল্পী’র অটোগ্রাফ সহ একটি বই উপহার পেলাম। এরপর গেলাম ইসমত শিল্পীর নিজস্ব স্টল ‘নান্দিক’ প্রকাশনীতে। অসংখ্য সুসজ্জিত প্যাভিলিয়নের মাঝে নান্দিক প্রকাশনী স্টলটি আমার উল্লেখযোগ্য নান্দনিক স্টল মনে হয়েছে। তিনিও অটোগ্রাফ সহ একটি বই উপহার দিলেন।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের স্টল ছিলো বিআরটিসির দ্বিতল বাসের মোটিভে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন আস্ত একটি বাস দাঁড়িয়েআছে। আমার বন্ধুবর কথাসাহিত্যিক হাসিনুর রশীদের ‘পাঠকবাড়ি’র স্টল খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু দৃষ্টি নন্দন প্যাভিলিয়নের ছবি তুললাম। তখন মনে পড়লো নান্দিক প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী ও নান্দনিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ইসমত শিল্পীর সেই লেখাটি। “বিরক্ত হইয়েন না, হ্যাঁ? ছোট মানে কম কিছু না। বৃহদাকার কলেবরের পাবলিসার্সরা কেউই এতোটা ধকল নিয়ে থাকে না, যতটা আমরা আছি। বলতে গেলে আমরাই আসলে সৃজনশীলতাকে ধরে রাখছি। বড়রা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা প্যাভিলিয়নে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাত্র।
বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই পুরনো। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বাংলা একাডেমিতে একুশের অনুষ্ঠানে কোনো বইমেলা হয়নি। ইতিহাস এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন।
তারও আগে বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি)। এটি ছিল মূলত শিশু গ্রন্থমেলা, যার আয়োজন করেছিলেন কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদদীন। তিনি একসময় বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন। এরপর আরো বড় আয়োজনে গ্রন্থমেলা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি।
১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তিনি। এই মেলায় আলোচনা সভারও ব্যবস্থা ছিল যাতে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এভাবেই বইমেলা চলতে থাকে। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি মেলা উপলক্ষে ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে একাডেমি প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। এর পাশাপাশি মুক্তধারা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স ও তাদের দেখাদেখি আরো কেউ কেউ বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের বই বিক্রির উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।
ওই সময় ৭ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৮১ সালে বইমেলার মেয়াদ ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন করা হয়। এরপর প্রকাশকদের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে মেলার মেয়াদ আবার ২১ দিনে বৃদ্ধি করা হয়। মেলার উদ্যোক্তা বাংলা একাডেমি। সহযোগিতায় ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। মূলত ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের করুণ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এই মেলার নামকরণ হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ যা নিয়মিতভাবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়। আশির দশকের সেই দিনগুলোর মেলায় সাজ্জসজ্জা ছিলো না, নিয়ন বাতি ছিলো, প্যাভিলিয়ন ছিলো না, এখনকার দিনের মত আলোক উজ্জ্বল ছিলো না। কিন্তু প্রাণ ছিলো।
মাহবুব শওকত
২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫।
