মুসাফির

এম আর আমিন,
কোথা থেকে এসেছি, কোথায় চলেছি আর কোথায় যাব মানুষ হিসেবে আমাদের ভাবনায় আছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ইসলামের আলোকে মানুষের সৃৃষ্টি, কর্ম এবং পরকাল সম্বন্ধে উল্লেখ আছে। মানুষ হিসেবে এসব ভাবনা আমাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র নেই। আমাদের স্বভাব, চিন্তা চেতনা বা কর্মে তা একেবারে বুঝায় না। আমরা যে দুনিয়াতে মুসাফির এবং মাত্র কদিনের জন্য এসেছি তা আমাদের মনে নেই। আমাদের চাই বাহাদুরী, ধনদৌলত, অর্থকড়ি, ক্ষমতা সবকিছু আমাদের এখন বেশী প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। হিংসা প্রতিহিংসা, পরচর্চা, বিদ্ধেষ আমাদের মাঝে ভালভাবে কাজ করতেছে। আমরা কোনদিন দুনিয়া থেকে যাবনা। অতীত কে নিয়ে চিন্তা করলেই বুঝবে আমাদের পূর্ব পুরুষরা কেউই দুনিয়াতে নেই। আমরা ও থাকবনা। এটা থাকার জায়গা নয়। কবে যে আমরা মানুষের মতো মানুষ হবো তা শুধু মহান আল্লাহ পাক জানেন। তবে আমরা যে অমানুষ হয়ে গেছি তা প্রায় নিশ্চিত। আমাদের মধ্যে মানবতার কোন কিছু নেই। তবে লোকিকতা আছে, অভিনয় আছে, তেলবাজ আছে, স্বার্থসিদ্ধির জন্য যা যা করা দরকার।
তা সবই আছে, নেই মানুষের মতো মন, মানুষের মতো চরিত্র। এখন আগের তুলনায় শিক্ষিতের হার বেশি। ডিগ্রীধারী মানুষের সংখ্যা কম নয়। মেধাবীর সংখ্যাও কম নয়। তবে এসব কোন ভাল কাজে আসেনা সেটা এখন সর্বজন স্বীকৃত। তাহলে আমাদের কে দিয়ে কি হবে ? যিনি আমাদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তার কাছে একদিন আমাদের ফিরে যেতে হবে। সেখানে আমাদের জবাবদিহিতা আছে। আমাদের সকল কাজের হিসাব দিতে হবে সেখানে। কি হিসাব দিব আমরা? তা জানা নেই। সুতরাং আমাদের জন্য ঘোর বিপদ পরকালে রয়েছে, যদি আমরা হিসাব দিতে না পারি। সেদিনের বিপদের দিনে আমাদের দুনিয়ার এত কিছু কি কাজে আসবে তা আমাদের সবার জানা থাকলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছেনা। কদিনের জীবন, শেষ হলে চলে যেতে হবে ওপারে। ভাল কিছু করে গেলে তাহলোতো কোন চিন্তা রইলোনা, তবে আমরা যা করছি তা বেশীর ভাগ ভালোর মধ্যে পড়েনা। অনেক আগে এ দেশে একটা বাংলা ছবি হয়েছিল, ছবিটির নাম “আবার তোরা মানুষ হ”।
জগতজুড়ে আছে মানুষে মানুষে বিভেদ, হিংসা হানাহানি। কোথায় আমরা ছুটে চলেছি তা আমাদের জানা নেই। গন্তব্য কোথায় তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করার সময় নেই। বাড়ছে আলেম ওলামার সংখ্যা, ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা, ইসলামী চর্চা, তবে আমরা এসব কাজে লাগাতে পারতেছিনা। পার্থিব জীবন নিয়ে আমরা এতটা ব্যস্ত যে, এসব চিন্তা করার সময় কই? কারো হাতে সময় নেই। সময় কিন্ত চলে যাচ্ছে এক মুহুর্তও সময় বসে নেই। অবহেলায় আমরা মূল্যবান সময় হারাচ্ছি। প্রতারনার ফাদ পাতা পৃথিবীতে আমরা প্রতারণার শিকার হচ্ছিনা তো। এখানে সব কিছু রয়ে যাবে আগের মতোই কিন্তুু আমরা কোন কিছুর বিনিময়ে থাকতে পারবনা এটা একেবারে গ্যারান্টি দেয়া। তবু ও আমরা পার্থিব জগতে শুধু চাই আর চাই। এ অতিরিক্ত চাওয়াটা আমাদের জন্য একদিন হয়তো কাল হয়ে দাড়াবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এই পার্থিব জগতে থাকতে পারবে না। এটাও একেবারে নিশ্চিত।
আমরা আজো বেঁচে আছি মহান আল্লাহর পাকের ইচ্ছার উপর। সৃষ্টির শুরু থেকে এ যাবৎ আমাদের পূর্বসুরীরা কোন ভাবেই দুনিয়াতে থাকতে পারেন নাই। আমরা এসব বেমালুম ভুলে গেছি। শুধু চাওয়ায় আর পাওয়ায় আমরা মেতে আছি। চাই আর চাই, লোভ লালসার উর্ধ্বে আমরা উঠাতে পারিনি। মানুষের নীতি নৈতিকতা কোন কিছু এখন আর নেই। সবাই আমরা ছুটছি আর ছুটছি। কোথায় যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি? মনে হয় জানিনা কেবলই এই চাওয়া পাওয়া,তা আর শেষ হয়না। আমরা এটা বুঝতে চাইনা যে, কোন একদিন এ সুন্দর পৃথিবীতে আমরা কেউই আজীবন থাকবোনা।
ব্যক্তি, সমাজ এবং বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে কোন ভূমিকা নেই বললে চলে। মানুষ ধীরে ধীরে আরো হিংসা অহংকারী, প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠছে। কোথাও কেউ নেই অবস্থা বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের একটিা কথা মনে পড়ে-বাঁচিতে চাহি আমি সুন্দর ভূবনে। রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীকে সুন্দর বলেছেন অথচ বরীন্দ্রনাথের এ কথাটি এখন উল্টো পথে চলেছে অনেক আগেই। পৃথিবী এখন বড় অসুন্দর। এই অসুন্দর পৃথিবী তৈরী হয়েছে মানুষের জন্যই। পৃথিবীর তার জায়গায় ঠিকই রয়ে গেছে কিন্তু বদলে গেছে।
পৃথিবীর মানুষ গুলো। চেনা মানুষ গুলো অচেনা হয়ে গেছে। আল্লাহ প্রীতি ও রসুল প্রীতি মুখে আছে, মনে নেই। এই আমাদের অবস্থা। বাস্তবতায় তা দেখা যায়না। মসজিদে গেলে আমরা ভালো মুসল্লী আর মসজিদের বাহিরে এলে আমাদের কথা ও কাজ পুরোপুরি উল্টো। পুরো দুনিয়া যদি শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে চলতো আর আমরা যদি দুনিয়াতে অস্থায়ী বাসিন্দা বা মুসাফির। কঠিন সত্যটা মেনে নিয়ে চলতাম তাহলে পৃথিবীটা একটা শান্তির নীড়ে পরিনত হতো।
