ভোলার নদ-নদীতে ইলিশের অকাল ॥ পেশা পাল্টাচ্ছে হাজার হাজার জেলে

এইচ এম নাহিদ ॥ ভরা মৌসূমে ইলিশ না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার উপকূলের প্রায় আড়াই লাখ জেলে। এতে দিনদিন কমছে জেলের সংখ্যা। ভোলা সদর, দৌলতখান, তজুমদ্দিন ও মনপুরার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ভরা মৌসূমেও ইলিশ শিকারের জন্য কাক ডাকা ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত জাল ফেলছেন জেলেরা। কিন্তু মিলছে না কাঙ্কিত ইলিশ। যা পাচ্ছেন তা বিক্রি করে খরচের পয়সাও উঠছেনা। এক বুক হতাশা নিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন জেলেরা। মহাজনের দাদন, এনজিওর কিস্তি, মুদি দোকানের দেনা পরিশোধের চিন্তা মাথায় নিয়ে শতশত জেলে ট্রলার ঘাটে বেঁধে আয় রোজগারের ভিন্ন পথে ঝুঁকছেন।
ইলিশ গবেষকরা বলছেন, নদীতে ডুবোচরের কারণে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে মিলছে না কাঙ্কিত ইলিশ। নদীতে ইলিশ না থাকায় এবছর এক লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই মৌসুমের ইলিশ এ অঞ্চলে আসছে না। তবে অসময়ে ইলিশ ধরা পড়তে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে। এদিকে, বছরের ৮ মাস জেলেদের জন্য ভিজিএফ প্রকল্প এ বছরের জুন মাসে শেষ হয়ে গেছে। ওই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতেও প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভাবী জেলেদের পুনর্বাসনের দাবির বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

সূত্রটি আরো বলছে, ভোলায় ইলিশ উৎপাদনের ( আহরণের) লক্ষ্যমাত্রা এবছর ধরা হয় ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্যে নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। যে অবস্থায় নদী গুলোতে ইলিশের অকাল চলছে তাতে এবছরে ইলিশের লক্ষমাত্রা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভোলার ইলিশা, ধনিয়া, রাজাপুর, ভোলার খাল, দৌলতখানের চৌকিঘাট, তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর, স্লুইসগেইট, মনপুরার জনতার বাজার, চর ফয়জুদ্দির ব্রীজঘাট, রাম নেওয়াজ ঘাট, চরফ্যাশনের বেতুয়া, শামরাজ ঘুরে দেখা যায়, সারাদিন নদী চষে নৌকা প্রতি মিলছে না ৩/৪টি ইলিশ। ওই ইলিশ বিক্রি করে টাকা মেলে ৩ হাজার। নৌকার জ্বালানি খরচ, প্রতিদিনের ব্যয় মিটিয়ে ভাগিদার ৮/১০ জনের একজন পান ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ওই টাকায় ৬/৭ জনের সংসার চলে না। অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে এদের।
মনপুরার জেলে, আলাউদ্দিন (৫৪), আকতার (৪৫) সেলিম (৪৮) জানান, অভিযানের সময় সাগরে ট্রলার ভাসাইতে পারিনাই, এহন অভিযান শেষ হইলো, সাগরে ট্রলার ভাসাইয়া ২৬ দিন পর হাতে পায়ে ঘরে আইছি। একটা টাহাও সংসারে দিতে পারিনাই। এরপর মহাজন, সমিতির কিস্তি কি করুম বুঝে ধরেনা। ভাবছি অন্য জাইল্লাগো মতো আমরাও কাম খুজুম। সংসার চালাইতে হইবেতো।
ভোলা সদরের গিয়াস উদ্দিন (৩৫) ,আবু কালাম (৪০) দুলাল (৫৫) মাঝি বলেন, আমরা জাইল্লা। মেম্বর, চেয়ারম্যান, আমাগোরে চাউলের কাড না দিয়া হেগো হোমরা, মোচরা (চেলা, চামচা) গোরে কাড দেয়। একটার যায়গায় দুইডাও হেরা পায়। ওগো বিচার আল্লায় করবো।
ইলিশের আড়তদার আবু ব্যাপারী জানান, তার আড়তে দাদনভুক্ত জেলে রয়েছে ৫০ জন। জেলেরা প্রতিদিন খালি হাতে নদী থেকে ফিরছে। ফলে দাদনের ১০/১৫ লাখ টাকা এবার ফেরত পাবার সম্ভাবনা নেই। ভোলার ১৫০টি মাছ ঘাটে মাছ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিমাণ বছরে ৫’শত কোটি টাকা। বছরে আয় হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এবার চালান উঠানোও মুশকিল হবে।
জেলেরা জানান, ভোলার শাহবাজপুর চ্যানেল ইলিশ বিচরণের জন্য খ্যাত। ওই চ্যানেলের মুখে কিছু প্রভাবশালী মাছদস্যু নিষিদ্ধ পাই জাল, বেড় জাল, বিহুন্দি জাল, মশারী জাল বসিয়ে ৩/৪ ইঞ্চির ইলিশ প্রজাতি বিনষ্ট করছে। এটা ওপেন সিক্রিট। প্রশাসন জেনেও চিহ্নিত ওই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। জেলায় ওই চক্রের সংখ্যা মাত্র ২০/২৫ জন। অথচ এরা ধ্বংস করে বেড়াচ্ছে কোটি কোটি টাকার ইলিশ প্রজাতি। বছরে ডিম ছাড়ার সময় এরা মা ইলিশও ধ্বংস করে। আবার জানুয়ারি-ফেরুয়ারি মাসে এরাই জাটকা বিনষ্ট করছে। ইলিশ প্রজাতি এভাবেই বিনষ্ট হওয়ায় এখন ইলিশ সংকট চলছে।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, জেলায় নিবন্ধনকৃত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ১৭ হাজার ১৩০ জন। অনিবন্ধনকৃত জেলে রয়েছে সমপরিমান। জেলে সূত্র থেকে জানা যায়, ২ লাখ জেলে ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও সাগর মোহনায় সরাসরি মাছ ধরা পেশায় জড়িত। মাছ বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন আরো ৫০ হাজার ।
জেলা মৎস কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডুবচরই ইলিশ বিচরণে মূল বাঁধা। নদী ড্রেজিং এর জন্য আমরা কাজ করছি। তাছাড়া এবার পর্যাপ্ত বর্ষা না হওয়ার কারনেও ইলিশ বিচরণ কম হতে পারে। আমরা আশা করছি বর্ষার প্রকৃত রুপরেখা প্রকৃতির সাথে মিশে গেলেই ভোলার নদীগুলোতে ইলিশের অকাল রোধ কেটে যাবে। এর ফলে আমাদের এ বছরের লক্ষা মাত্রাও পূর্ণ হবে আশা করছি। জেলেদের হতাশ হওয়ার কারন নেই অচিরেই নদীতে ইলিশ শঙ্কট কেটে যাবে।
