ভোলাকে ট্রানজিট বানিয়ে ছড়াচ্ছে মাদক, ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা!

ভোলার বানী ডিজিটাল ডেক্স
বিস্তৃত নৌপথ আর চরাঞ্চল ঘেরা দ্বীপজেলা ভোলা। যার তিন দিকে নদী, একদিকে সুনীল বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিক এই সুবিধাই এখন কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা। সমুদ্র ও নৌপথে আসছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালান। ভোলাকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
কোথা থেকে আসছে এসব মাদকের চালান? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই নেটওয়ার্ক? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বারবার বাহক ও খুচরা কারবারিরা ধরা পড়লেও বড় চালানের নেপথ্যের কারিগররা কেন থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে—এসব প্রশ্ন ঘুরছে ভোলাজুড়ে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিয়ানমার থেকে আসা মাদক টেকনাফ, কক্সবাজার ও ভাসানচর হয়ে নৌপথে ভোলায় ঢুকছে। জেলার চরফ্যাশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে বড় চালানের অন্যতম রুট হিসেবে। বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে পাচারের বিপরীতে দেশে ঢুকছে মাদকের চালান—এমন অভিযোগও রয়েছে। পরে ভোলাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব মাদক পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভোলার অবস্থান। নদী ও সমুদ্রপথের বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা জেলার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও নজরদারির দুর্বলতার সুযোগে এসব পথ মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম চর, মাছ ধরার ট্রলার ও বিচ্ছিন্ন নৌপথকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা—এমন দাবি স্থানীয়দের।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ভোলায় মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৫৪০টি। এসব মামলায় আটক হয়েছেন ৭৩০ জন। বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য।
তবে এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও থামছে না মাদকের কারবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে মূলত বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীরাই ধরা পড়ছেন। বড় চালানের অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কম। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব ও অর্থের জোরে একটি প্রভাবশালী চক্র মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এক মাদক কারবারির দাবি, এখন একেকটি চালানেই প্রায় দেড় কোটি টাকার মাদক ঢুকছে। আরেকজন অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেক সময় ধরা হয় না; অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের আটক করে অর্থ দাবি করা হয়। টাকা দিতে পারলে ছেড়ে দেওয়া হয়, না হলে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলেও তাঁর অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, মাদকের কারবারকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনাও ঘটছে। মাদকবিরোধী অভিযান ও কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তাঁদের। একই সঙ্গে কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো বলছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ভোলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. বদরুল হাসান বলেন, ‘আমরা সবকিছু মিলিয়ে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, তার মধ্য দিয়ে আমাদের যতটুকু সম্ভব করার চেষ্টা করবো।’
ভোলার পূর্ব ইলিশা সদর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, ‘নদী থেকে ১৫০ মিটার উঠে গেলে সেখানে আমাদের জুরিসডিকশন শেষ। তারপরও যেহেতু এটাকে মাদকের একটা ট্রানজিট পয়েন্ট বলে শুনতেছি, সেই হিসেবে আমরা তৎপরতাও বৃদ্ধি করেছি।’
কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার বিএন জামিলুর রহমান বলেন, ‘সন্দেহভাজন ফিশিং ট্রলার ও অন্যান্য জলযানে নিয়মিত তল্লাশি এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিবহন সংকটের কারণে নদীপথে নজরদারি ও অভিযান পরিচালনায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।
জেলা পুলিশ বলছে, শুধু বাহক নয়, বড় মাদক কারবারিদের শনাক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের তথ্য এবং মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
ভোলার পুলিশ সুপার পিপিএম মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, ‘মাদকের সাথে জড়িত গডফাদার যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধে মাদক মামলার পাশাপাশি, মানিলন্ডারিংয়ের মামলাও যাতে তাদের বিরুদ্ধে হয়, আমরা সেই ব্যাপারে সিআইডিকে তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করছি।’
মাদক কারবারের এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু চালান আটক কিংবা বাহক গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অনুসন্ধান করতে হবে মাদকের উৎস থেকে শুরু করে পরিবহন, অর্থায়ন, স্থানীয় পরিবেশক এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পুরো নেটওয়ার্ক।
কারণ বাহক ধরা পড়ছে, খুচরা বিক্রেতাও গ্রেপ্তার হচ্ছে—কিন্তু বড় চালানের নেপথ্যের কারিগররা যদি থেকে যান আড়ালে, তাহলে নদী-সাগরঘেরা ভোলাকে মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার বন্ধ হবে কীভাবে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে।
