বিশ্ব স্বাস্থ্য ও বাংলাদেশ

বর্তমান করোনা সংকট এর প্রেক্ষাপট বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়ে সকল দেশের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রনায়কদের গভীর ভাবে ভাবা উচিত। যেমন : বিশ্বের সকল দেশগুলোর মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা, মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন ভাইরাস আক্রান্তে মৃত্যুর হার কমানোর জন্য মানবিক ও পারস্পরিক সহায়তা প্রদান, করোনা ভাইরস জনিত মহামারীর সরাসরি প্রত্যেক্ষ প্রভা, বিশ্ব নিরাপত্তার প্রশ্নে পারস্পরিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বিনিময় একান্ত প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে করোনা আক্রান্ত বিশ্বের রোগ প্রতিরোধ এবং রোগ নির্মূলের জরুরী উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এক কথায় বলা যায়- জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের ক্ষেত্রে। বশ্বিব্যাপি স্বাস্থ্য বিষয়ক সহযোগতামূলক প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে এক সময় বোঝাত মূলত স্বল্প ও নিন্ম আয়ের দেশসমূহকে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমার মধ্যে সীমাবন্ধ নয়। এই মূহুর্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রমে বিশ্বের সব কয়টি দেশের অংশ্রগহণ জরুরী হয়ে পরেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ফলে, যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণে পৃথিবীতে পন্যের মতো ভাইরাস রোগ বালাই করোনা ভাইরাসের মত দ্রুত ছড়িয়ে পরতে পারে। বিশ্বায়নের ফলে বর্তমানে বিশ্ব্যাপি করোনা ভাইরাস একটা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশের জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে।
ইতিপূর্বে সার্স, বাডফ্লু ইত্যাদি রোগ এর ক্ষেত্রেও আমরা প্রত্যেক্ষ করেছি। সুতরাং ছড়িয়ে পরা ভাইরাস কোন দেশের জন্য নিরাপদ ভাবার কোন কারণ নাই। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের একটা সংক্রামক রোগ অন্য যে কোন দেশের জন্য একটা মারাত্মক ঝুঁকি হিসাবে দাড়িয়েছে। এই ভাইরাস রোধের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়ে জাতিসংঘের একটা জরুরী সভা আহ্বান করা জরুরী বলে মনে করি।
বিশ্ব নিরাপত্তার কথা ভাবতে হলে আমাদেরকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্যের কথাও ভাবতে হবে। আমরা জানি স্মলপ্রকা বা গুটিবশন্ত এবং ম্যালেরিয়া নির্মূল এর কর্মসূচী সম্পর্কে। আমাদের দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে গুটি বশন্ত নির্মূলের ব্যাপক কর্মসূচী নেয়া হয়। এই জন্য স্থানীয় পর্যায় বিশেষ কর্মী বাহিনী তৈরী করা হয়। এতে করে ১৯৭০ দশকে আমাদের দেশ সহ পৃথিবী থেকে গুটি বশন্ত নির্মূল হয়ে যায়। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য একটি নীতিমালা ঘোষণা করেন। সেই লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপি নানা কর্মসূচী নেয়া হয়। তবে তা সফল হয় নাই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত উপর বিশ্লেশষ হলো এই যে, স্বাধীনতার পর ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের জন সংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে, মাতৃ মৃত্যুর হার কমেছে, কমেছে শিশু মৃত্যুর হার। এই সাফল্যগুলি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের গৃহিত কর্মসূচীর সুফল।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্ত এর সংখ্যা ২,৮১৭ জন। সারাদেশে আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫৬,৭৫৮ জন। বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মেয়াদে বর্তমান জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার ২২টি মেডিকেল কলেজ, ১টি ডেন্টাল কলেজ ও ৮টি ডেন্টাল ইউনিট এবং বেসরকারী ভাবে ৫৪টি মেডিকেল কলেজ, ১৩টি ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমোদন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের নেতৃত্বে জনস্বাস্থ্য সুচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে। শিশু মৃত্যু রোধ এই অর্জন এর জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনাকে পুরস্কৃত করেছে জাতিসংঘ।
তবে এ কথা সত্য, সঠিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবার মান এবং স্বাস্থ্য সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে ধনি ও গরিবের মধ্যে। প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো থাকলেও তার ব্যবহারে ডাক্তার এর সহজলভ্যতা নাই বল্লেই চলে। জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসা দানকারী আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সংখ্যা যা নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে আমাদের দেশের জন্য আরো ৬০ হাজার ডাক্তার এর প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রায় ৩ লক্ষ নার্স। বর্তমান স্বাস্থ্য কাঠামো দেশটির সামগ্রীক অর্থনীতির সাথে যুক্ত। স্বাস্থ্য সেবাকে মৃক্ত বাজার পন্য এর মতো ব্যক্তিখাতে রেখে দেয়ার কারণে এ দেশে স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য তৈরী হয়েছে।
বর্তমানে করোনা সংকটর এর প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানী খাতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উদাসিনতা বা দায়িত্বহীনতা লজ্জাজনক ভাবে প্রমানিত হয়েছে। এমত অবস্থায় পাবলিক সেক্টরে সরকারী হাসপাতালগুলিকে চাহিদামত যন্ত্রপাতি, মেডিকেল ইকুপমেন্ট প্রদান করে গবেষণা সেল তৈরী করার মাধ্যমে আরো উন্নত পরিশেবা জোড়দাড় করা আজ সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীলদেশ কিউবা আজ বিশ্বে স্বাস্থ্য সেবা এবং উন্নত গবেষণার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরী করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার স্বাস্থ্য সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করেছন তা ভন্ডুল হতে চলছে কিছু অসৎ রাজনীতিক, দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলা ও কিছু ডাক্তার-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও উদাসীনতার কারণে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার ইতিমধ্যে কমিউনিটি বেইজড হেল্থ কেয়ার (সিবিএইচসি) অপারেশনাল প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নয়ন কার্যক্রম জোড়দার করণ করেছেন। এ পর্যন্ত সারাদেশে ৩০০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্স ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নতি করেছেন। এতে করে ৫,৭০০টি শয্যা বৃদ্ধি পয়েছে। টেকসই উন্নয়ন এর অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োগ এই বিশেষ উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১০টি বিশেষ উদ্যোগ অন্যতম।
সর্বোপরি বিশ্ব স্বাস্থ্যের উপর বর্তমান করোনা ভাইরাস জনিত হুমকি বিশ্ব পরিবেশের পরিবর্তন জনিত প্রভাব স্থানীয় স্বাস্থ্যখাত এর উপর পরেছে। তাই আমাদের ভাবতে হবে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে। মোকাবেলা করতে হবে দেশীয় প্রেক্ষিতে।

লেখক :
ফজলুল কাদের মজনু
সভাপতি
ভোলা জেলা আওয়ামীলীগ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।