ভোলার দ্বীপজেলায় শিশু বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে প্রায় ৬ লাখ শিশুর সুচিকিৎসা বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলার সাতটি সরকারি হাসপাতালে পাঁচটি হাসপাতালে শিশু চিকিৎসক নেই। বর্তমানে পুরো জেলায় মাত্র ২ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। এই কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে নামমাত্র সেবা নিয়েই হাসপাতাল ছাড়তে হচ্ছে সেবাপ্রার্থী শিশুদের, বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের।
বছরের পর বছর ধরে এই সংকট চলতে থাকলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ভোলা জেনারেল হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের শয্যার সংখ্যা ৬০। কিন্তু গত এক বছরে এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে তিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। স্থান সংকুলানের অভাবে শিশুদের মতো সংবেদনশীল রোগীদের হাসপাতালের বারান্দা, চলাচলের স্থান ও সিঁড়ির কোণে রাখা হচ্ছে।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার জন্য এখানে মাত্র একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. সালাহউদ্দীন হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের দেখতে ছোটাছুটি করছেন। তিনি শিশু ওয়ার্ড থেকে হাম ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে, আবার সেখান থেকে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে যাচ্ছেন। ইনডোরে সকালে রোগী দেখা শুরু করলেও দুপুর গড়িয়ে গেলেও শেষ হচ্ছে না। এদিকে, আইটডোরেও অসুস্থ শিশু নিয়ে অনেক অভিভাবক অপেক্ষা করছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করেও রোগীর অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করতে পারছেন না চিকিৎসক। আবার রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়ে ডাক্তার নিজেও অখুশি।
ডা. মো. সালাহউদ্দিন জানান, একজনের পক্ষে এত রোগীর সঠিক চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব। শিশুর অভিভাবকদের সব কথা শোনা সম্ভব হয় না। তবুও তিনি সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শিশুরোগ চিকিৎসক না থাকায় জেলা সদরে সবসময় রোগীর চাপ বেশি থাকে। রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে ডাক্তারদের সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
গত সোমবার দুপুরে ঠান্ডায় আক্রান্ত ৯ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে আনসার উদ্দিন দম্পতি ভোলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আসেন। আনসার উদ্দিন জানান, তার বাড়ির পাশে তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। সেখানে শিশুরোগের চিকিৎসক না থাকায় তিনি প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভোলা হাসপাতালে এসেছেন। কর্তৃপক্ষ ভর্তি করালেও কোনো বেড নেই এবং ডাক্তারের দেখা পাচ্ছেন না। তাই তার উৎকণ্ঠা কমছে না।
২০২২ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী, ভোলায় ০-১৪ বছর বয়সী মোট শিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশু ৪ লাখ ২৭ হাজার। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে বর্তমানে ৫ বছরের নিচে শিশুর সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজার। এসব শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলা উপজেলার ৭টি হাসপাতালে মোট ৮ জন শিশু বিশেষজ্ঞের পদ রয়েছে। এর মধ্যে সদরে জেনারেল হাসপাতালে একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট ও লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট আছেন। বাকি ৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা না পেয়ে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা জেলা সদরের দিকে ছুটছেন।
সদর হাসপাতালের একমাত্র ডাক্তারের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোগীর কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ। শিশু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি অভিভাবকদের অভিযোগের শেষ নেই। মরজিনা বেগম, রিয়াজ উদ্দিন, রহমত আলীসহ অনেকের অভিযোগ, চিকিৎসক না থাকার কারণে শিশুরা চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুর মা মনিরা বিবি বলেন, অসুস্থ শিশুকে ডাক্তার দেখানোর জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু সেখানে ডাক্তার নেই। তাহলে আমরা কোথায় যাব? তার মতে, বেসরকারিভাবে চিকিৎসা করানোর সামর্থ তার নেই।
ডাক্তার সংকটের কারণে শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে জানান হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান। তিনি বলেন, একজন ডাক্তার দিয়ে তারা সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিশুরোগের চিকিৎসক প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ভোলা দ্বীপ এলাকা হওয়ায় জেলার সব রোগী সদর হাসপাতালে আসে।
সিভিল সাজন ডা. মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, জেলার ৭টি হাসপাতালে মোট ৮ জন শিশুরোগ চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে সদর হাসপাতাল ও লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। বাকি ৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এতে শিশুদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। শূন্যপদে ডাক্তার নিয়োগের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
চিকিৎসক সংকট অন্যান্য বিভাগেও বিদ্যমান। ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকের ৮৭টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৭ জন ডাক্তার।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ