মো. সামিরুজ্জামান ও সোহেল রানা ॥ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোলা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে আগ্রহীরা ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি সহায়তার সুষ্ঠু বণ্টন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম তৎপরতায় ইউনিয়নগুলোতে নির্বাচনী আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। ২৭ মে’র মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ঠাকুরগাঁও জেলা বাদে দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৮০টি উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন আটকে থাকা ইউনিয়ন এবং জেলা সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় রয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলের ওপর।
ভোলা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন হলো-রাজাপুর, পূর্ব ইলিশা, পশ্চিম ইলিশা, কাচিয়া, বাপ্তা, ধনিয়া, শিবপুর, আলীনগর, চরসামাইয়া, ভেলুমিয়া, ভেদুরিয়া, উত্তর দিঘলদী ও দক্ষিণ দিঘলদী। এসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদেও আগ্রহীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কেউ স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। আবার কেউ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে পরিচিতি বাড়াচ্ছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতার পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে আলোচনা থাকলেও ভোলা সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি বলে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন দলের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে একাধিক প্রার্থীর নাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তবে দলীয়ভাবে ঘোষিত প্রার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য তালিকা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। দল দুটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ইউনিয়নগুলোতে পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করছেন বলে জানা গেছে। তবে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে তাঁদের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী তালিকা এখনো নিশ্চিত নয়।
দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন অর্জন, সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণকে অনেকে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনী আলোচনা ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, সরকারি সহায়তার সুষ্ঠু বণ্টন এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির বিষয়গুলো।
পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের ভোটার মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, এলাকার সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি সংঘাত-হানাহানিমুক্ত পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা জানান। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সোহেল স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান চান। তাঁর প্রত্যাশা, জনপ্রতিনিধিদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও দুর্ভোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আলীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. হিরন সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত না হন।
ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন স্থানীয় উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রত্যাশা করেন, এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ করতে জনপ্রতিনিধিরা কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
বাপ্তা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিরা যেন মানুষের সমস্যা শোনেন, তাঁদের পাশে থাকেন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
স্থানীয় ভোটারদের এসব বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁদের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নকাজের বাস্তবায়ন, সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা চান তাঁরা। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে এলাকার সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা তুলে ধরার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভোলা সদর উপজেলায় মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮৭ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৩২ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৫৫০ জন এবং অন্যান্য ভোটার ৫ জন। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি ও ভোটার তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
আগের ঘোষণা অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখ ২৫ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভোলা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই আল-হাদী জানান, জনবল সংকট থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন তাঁদের দপ্তরগুলোতে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, এলাকা পরিবর্তন ও ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য সেবাগ্রহীতারা আসছেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ভোলা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম তৎপরতা নির্বাচনী প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন, কারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন কার দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা, দলীয় প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ