মো. সজীব মোল্লা, মনপুরা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মানুষ এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেড় লাখের বেশি মানুষের এ উপজেলায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে এলাকাভিত্তিক ভাগ করে দিনে-রাতে মিলিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুতের এমন সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের কুপি, হারিকেন ও সৌরবাতির আলোয় পড়তে হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোর নিয়মিত কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারের সময়ে মনপুরায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশার বিপরীতে বর্তমানে মাত্র দুই ঘণ্টার মতো সরবরাহ পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হলেও নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
মনপুরা বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সেখানে ৬৫০ কেভিএ, ৫০০ কেভিএ ও ৫০০ কেভিএ ক্ষমতার তিনটি জেনারেটর রয়েছে। এর মধ্যে একটি বর্তমানে বিকল। সচল দুটি জেনারেটর দিয়ে পার্টটাইম ও এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এর আগে ১ হাজার কেভিএ ক্ষমতার একটি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। সেটি বিকল হওয়ার পর সংকট আরও তীব্র হয়। পরে পুরোনো তিনটি জেনারেটরের মাধ্যমে সরবরাহ সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি বিকল থাকায় বর্তমানে দুটি জেনারেটরের ওপরই পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নির্ভর করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সুমন বলেন, ‘ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাই না। অথচ প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। বর্তমানে রাতে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাই। বিদ্যুতের অভাবে দোকানের ফ্রিজসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।’ তিনি জানান, সন্ধ্যার পর অনেক ব্যবসায়ী সৌরবাতি, মোমবাতি ও চার্জার লাইটের সাহায্যে দোকান চালান।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, জ্বালানি বরাদ্দ থাকার পরও যদি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাহলে এর কারণ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা চান তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। হাজিরহাট সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিয়া আক্তার সানিয়া বলেন, ‘কুপি বাতির আলোতে খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করছি। আমরা মনপুরায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ চাই।’
একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. শাফায়াত রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে হারিকেনের আলোয় পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিদ্যুতের অভাবে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। রাতে তারা ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারছে না। দ্রুত সংকটের সমাধান এবং মনপুরায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মনপুরা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, তিনটি জেনারেটরের একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুটি মেশিন দিয়ে পার্টটাইম ও এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। নষ্ট জেনারেটরটি মেরামতের কাজ চলছে।
জ্বালানি বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব না হলে বরাদ্দের জ্বালানি অব্যবহৃত থাকে। ওই জ্বালানি ফেরত দেওয়া হয় অথবা পরবর্তী মাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
আবাসিক প্রকৌশলী আরও বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া মনপুরার চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব নয়।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ