
দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে ভোলার গ্যাস। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নতুন করে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এরই মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, ভোলার গ্যাস স্থলভাগে এনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সম্ভাব্যতা জরিপ ও দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভোলায় এখন পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে এবং প্রতিটি কূপেই গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। ভোলা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় আরও গ্যাসের মজুত থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে এবং দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর বড় একটি অংশ নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মাণ করতে হতে পারে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় সাধারণ স্থলভাগের পাইপলাইনের তুলনায় বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খুলনা পর্যন্ত জাতীয় গ্যাস গ্রিড সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এই গ্যাস উত্তরাঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভোলার বোরহানউদ্দিনে ১৯৯৫ সালে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৩১ বছর। এত সময়েও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এর আগে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা রুটে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা যাচাইও শুরু হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগও এগোয়নি। এখন আবার ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটকে সামনে রেখে নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভোলায় এখন পর্যন্ত তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোলা ইস্ট ও ভোলা নর্থসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কূপ বর্তমানে উৎপাদনযোগ্য, যেগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। অপর চারটির মধ্যে একটি কূপের পাইপলাইন এবং তিনটির প্রসেস প্ল্যান্ট প্রস্তুতের কাজ চলছে।
তবে স্থানীয় চাহিদা সীমিত হওয়ায় বর্তমানে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। পাইপলাইন না থাকায় এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও নেই।
ভোলায় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে আরও ১০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। এর মধ্যে ভোলা নর্থ-৫ মূল্যায়ন কূপ, ভোলা নর্থ-৬ ও ৭ অনুসন্ধান কূপ এবং শাহবাজপুর-৯ মূল্যায়ন কূপ ও শাহবাজপুর-১০ অনুসন্ধান কূপের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ১০টি কূপের প্রতিটি থেকে গড়ে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস পাওয়া গেলে দৈনিক আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে। এর সঙ্গে বর্তমানে অব্যবহৃত ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হলে ভবিষ্যতে ভোলা থেকে দৈনিক ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলার বেশ কয়েকটি গ্যাসকূপ খনন করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম।
ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় কত হবে, তা সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীপথে পাইপলাইন নির্মাণ এবং বর্তমান নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় প্রকল্পটির ব্যয় বড় অঙ্কে পৌঁছাতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট-বাখরাবাদ ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৪৭৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়েছিল প্রায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ছাড়া ওই সময়ের তুলনায় বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। ফলে নতুন প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। আর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
একসময় দেশের দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হলেও বর্তমানে তা ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। দেশের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানাতেও উৎপাদন কমেছে। ফলে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার দাবি ও প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, ভোলার গ্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেরি হয়েছে। পাইপলাইন নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় এখন কাজ শুরু করলেও সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
বাপেক্সের কর্মকর্তাদের মতে, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার উদ্যোগ আরও কয়েক বছর আগে বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান গ্যাস সংকট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। এখন দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভোলার গ্যাসের গুরুত্বও বেড়েছে।
ভবিষ্যতে ভোলায় আরও কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই অঞ্চলের গ্যাস দেশের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি দ্রুত ও টেকসই পরিবহন অবকাঠামো নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ