
মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ দ্বীপ জেলা ভোলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, চর, ম্যানগ্রোভ বন, সমুদ্রসৈকত, বন্যপ্রাণী, আধুনিক স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের সমন্বয়ে ভোলা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন জেলায় পরিণত হচ্ছে। অথচ পর্যাপ্ত প্রচার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনও জাতীয় পর্যায়ে তেমন পরিচিতি পায়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে অন্তত ১৭টি নিবন্ধিত পর্যটন স্পট রয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যা পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে চরফ্যাশনের চর কুকরি-মুকরি। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত এই দ্বীপটি ম্যানগ্রোভ বন, হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি, নদীর ঢেউ এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। অনেকেই একে "দক্ষিণের ক্ষুদ্র সুন্দরবন" বলেও অভিহিত করেন।
ভ্রমণপিপাসুদের আরেকটি প্রিয় গন্তব্য মনপুরা দ্বীপ। নদী, সবুজ প্রকৃতি, হরিণ, ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণপ্রসাদ মেলা এবং সুস্বাদু ইলিশের জন্য মনপুরা সারা দেশে পরিচিত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক সেখানে ছুটে যান।
চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার দেশের অন্যতম উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ারগুলোর একটি। প্রায় ২২৫ ফুট উঁচু এই টাওয়ারের চূড়া থেকে চর কুকরি-মুকরি, মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা এক নজরে দেখা যায়।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে তাড়ুয়া সমুদ্রসৈকত ও ঢালচর ম্যানগ্রোভ বন। নির্জন সমুদ্রসৈকত, বালুকাবেলা, কেওড়া ও গেওয়া গাছের বন এবং নদী-সাগরের মিলনস্থল পর্যটকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
ভোলা সদরের মেঘনা-শাহবাজপুর পর্যটন কেন্দ্র (তুলাতলী) এখন স্থানীয়দের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র। মেঘনার তীর, বিকেলের সূর্যাস্ত ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেন। এছাড়া মেঘনা রিভার ইকোপার্ক, ভোলা কায়াকিং পয়েন্ট, মঙ্গল শিকদার লঞ্চঘাট, মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন, সাকুচিয়া দক্ষিণ ইউনিয়ন ম্যানগ্রোভ বন এবং শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া ভোলার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে লালমোহন পার্ক, ইলিশ ফোয়ারা, বক ফোয়ারা, নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন মসজিদ, সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল পার্ক এবং ভোলা শহরের বিভিন্ন নদীতীরবর্তী বিনোদন এলাকা।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার দক্ষিণাঞ্চলে মেঘভাসান, আইচা, লেতরা, নীলকমল, কচ্ছপিয়া, চরমঙ্গল, চরকিশোর, মায়ারচর, চর ফকিরা ও লক্ষ্মীপক্ষীসহ বিভিন্ন চরও তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এসব এলাকায় পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক দর্শনীয় স্থানে এখনো নেই মানসম্মত সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ নৌযান, আবাসন, রেস্তোরাঁ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবা। ফলে অনেক পর্যটক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ভ্রমণ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
স্থানীয়দের মতে, চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা, তাড়ুয়া সমুদ্রসৈকত, জ্যাকব টাওয়ার ও মেঘনা নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকে একীভূত করে আধুনিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা গেলে ভোলা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার এবং জেলার অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জেলা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে ভোলা ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ