
স্টাফ রিপোর্টার :
সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য থাকলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও ভবনের নির্মাণমান নিয়েও একাধিক অনিয়ম ও দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে আধুনিক পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে ‘১৭টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট (সংশোধিত ১৬টি) অফিস নির্মাণ (২য় সংশোধন)’ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। পরে তা বাড়িয়ে প্রায় ১০৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয় ৯৭ কোটি ৭৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর, জামালপুর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে মোট ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্মাণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় গাজীপুরের কার্যালয় পরবর্তী পর্যায়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।
আইএমইডির মূল্যায়নে দেখা গেছে, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ১৫ লাখ ১ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনে (পিসিআর) এ খাতে ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো কার্যালয়েই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
একইভাবে, বনায়নের জন্য ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ এবং ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও অধিকাংশ কার্যালয় প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণের প্রমাণ মেলেনি। এ কারণে ব্যয়ের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো বাহ্যিক অডিট সম্পন্ন হয়নি। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ অডিট সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। জামালপুর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মাগুরা, বাগেরহাট, নেত্রকোনা ও নওগাঁ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল রয়েছে। সাতক্ষীরা কার্যালয়ে মেরামতের কাজ চলছে। শরীয়তপুর কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল থাকলেও স্টোরেজ ব্যাটারি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ভোলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সৌর প্যানেলের একটি অংশ নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।
নির্মাণমান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ভবনের মান সন্তোষজনক নয়। ভবনের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার খসে পড়েছে, বাইরের রঙ নষ্ট হয়েছে এবং দেয়ালে শেওলা জমেছে। বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় ভবনটি ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে।
এ ছাড়া মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বজ্রনিরোধক দণ্ড ভবনের সর্বোচ্চ স্থানে স্থাপন না করায় বজ্রপাতের সময় ভবন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর না হওয়ায় প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতেও প্রশাসনিক অস্থিরতার চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০১৬ সালের ৩০ জুন একনেকে অনুমোদনের পর ১৭ জুলাই প্রথম প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নকালে মোট ছয়বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়।
আইএমইডি সুপারিশ করেছে, অচল সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বাগেরহাট কার্যালয় দ্রুত হস্তান্তর, মাদারীপুরে বজ্রনিরোধক দণ্ড পুনঃস্থাপন এবং ভোলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিম্নমানের নির্মাণকাজ দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও বনায়ন খাতে দেখানো ব্যয়ের বাস্তবতা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ই-পাসপোর্ট আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই আরও সহজ ও নির্ভুল করতে ই-পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বায়োমেট্রিক ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ) এটিএম আবু আসাদ বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। বিস্তারিত জেনে পরে মন্তব্য করবেন। তবে তার দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলার পাসপোর্ট অফিস অন্য অনেক সরকারি কার্যালয়ের তুলনায় বেশি পরিচ্ছন্ন এবং সেখানে তুলনামূলক বেশি গাছপালা রয়েছে।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ