স্টাফ রিপোর্টার ॥
ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় যাতায়াতের একমাত্র সি-ট্রাকটি প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন শত শত যাত্রী। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন। এতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা। দুই মাস ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উত্তাল মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে মনপুরা টু তজুমদ্দিন এবং তজুমদ্দিন টু মনপুরা রুটে চলাচল করতো একমাত্র সি-ট্রাক ‘এসটি ইলিশা’। কিন্তু প্রায় দুই মাস আগে ইঞ্জিন বিকল হয়ে বন্ধ হয়ে যায় সি-ট্রাকটি। এরমধ্যে পরিবর্তন হয় ইজারাদার। নতুন ইজারাদার নিয়োগ হলেও আজও চালু হয়নি সি-ট্রাকটি। ফলে প্রতিদিনই অবৈধ ট্রলার দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মনপুরা উপজেলা থেকে তজুমদ্দিন এবং তজুমদ্দিন থেকে মনপুরা যাতায়াত করছেন শত শত যাত্রী।
মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি ডেঞ্জার জোন হওয়ায় চলতি মৌসুমে প্রতিদিনই ভয় ও আতঙ্ক সঙ্গী হচ্ছে যাত্রীদের। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা। ওই রুটের যাত্রী মো. করিম ও বিশ্বজিৎ কুমার জানান, তারা প্রতিনিয়ত মনপুরা থেকে তজুমদ্দিন এবং তজুমদ্দিন থেকে মনপুরা যাতায়াত করেন। সি-ট্রাক থাকাকালীন তারা নিরাপদে যাতায়াত করতেন। কিন্তু দুই মাস ধরে সি-ট্রাক বন্ধ রয়েছে। এর পরিবর্তে কয়েকটি ট্রলার চলে। ট্রলারে চলাচল করা জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। নদীতে প্রচুর স্রোত থাকে। ঝড়ের বিষয়টিতো রয়েছেই।
ক্ষোভ প্রকাশ করে এই দুই যাত্রী বলেন, তজুমদ্দিন ও মনপুরা নৌ রুটটি ‘ডেঞ্জার জোন’। অথচ বিআইডব্লিউটিসি দুই মাসের মধ্যে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তারা কি কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সি-ট্রাক চালু করবেন? মনপুরার একটি কলেজের প্রভাষক খালেদা রোকসানা। তার বাড়ি খুলনায়। সব সময় তজুমদ্দিন ঘাট হয়ে মনপুরা যান। মনপুরা যেতে বড় নদী ও উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয়।
রোকসানা আক্তার বলেন, নদীর যে স্রোত তাকে মনে হয় সাগর পাড়ি দিয়ে মনপুরা যাচ্ছি। সি-ট্রাক থাকলে ঝুঁকিটা কম থাকে। কিন্তু ট্রলারে এই নদী পাড়ি দেওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দুই মাস ধরে সি-ট্রাক বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির কোনো ভূমিকা নেই। এতে বোঝা যায় বিআইডব্লিউটিসি তাদের দায়িত্ব পালন করছে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিসি কি তাদের ইচ্ছামতো এটি চালু করবে, নাকি এই রুটে দুর্ঘটনায় কয়েকটি মৃত্যু হলে তারপর সি-ট্রাক চালু হবে? তাদের উচিত এটি পরিষ্কার করা। যাত্রী মিজানুর রহমান ও মো. মহিউদ্দিন বলেন, এটি চরম অবহেলা যে দুই মাস ধরে সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ আছে। অথচ বিআইডব্লিউটিসি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটা পরিষ্কার বিআইডব্লিউটিসি মনপুরা ও তজুমদ্দিন রুটের যাত্রীদের সঙ্গে চরম স্বেচ্ছাচারিতা করছে। সি-ট্রাকে সময় লাগতো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। আর ট্রলারে সময় লাগে ৩-৪ ঘণ্টা। এতে আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে’ যোগ করেন এই দুই যাত্রী।
ভোলা সদরে বাড়ি জামাল উদ্দিন ও হারুন মিয়ার। তারা দুজনই আদালাভাবে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এজন্য প্রতিনিয়ত তাদের মনপুরা যেতে হয়। তারা বলেন, মনপুরা উপজেলায় নিরাপদ যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম সি-ট্রাক। কিন্তু এভাবে যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তাহলে যাত্রীরা কীভাবে নিরাপদে যাতায়াত করবেন? এই রুট তো ‘ডেঞ্জার জোন’। এখন ট্রলারে যাতায়াত করতে নিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে অনেক যাত্রীর প্রাণহানি হবে। তখন এর দায়ভার কে নেবে?
ভোলার চরফ্যাশনে বাড়ি আনোয়ারা বেগমের। তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন মনপুরায়। মেয়ে অসুস্থ শুনে মনপুরার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন। চরফ্যাশন থেকেও মনপুরা যাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে কোনো নিরাপদ নৌযান না থাকায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা তজুমদ্দিন এসেছেন সি-ট্রাকে করে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে এসে দেখেন সি-ট্রাকটি বন্ধ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ট্রলারে করে যেতে হবে। তবে যাত্রাপথে তার ভয় নদীর ঢেউ।
মালেকা বেগম বলেন, মনপুরা থেকে ট্রলারে করে তজুমদ্দিন ঘাটে এসেছি। তবে পুরো যাত্রাপথে আতঙ্কে ছিলাম। বড় বড় ঢেউয়ে ট্রলার কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি ডুবে যাবে। তিনি বলেন, আমার ছেলে ও মেয়ে নিয়ে মনপুরা থেকে এসেছি। জীবনে আর কখনো ট্রলারে যাতায়াত করবো না। যদি সি-ট্রাক বন্ধ থাকে, তারপরও আর ট্রলার দিয়ে যাত্রা নয়। আমাদের জীবনের মূল্য আছে।
যাত্রী নুর ইসলাম ও ইব্রাহীম জানান, মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক যাত্রী যাতায়াত করেন। অথচ কারো কারণ ছাড়াই মাঝে মধ্যে সি-ট্রাক বন্ধ থাকে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
অবৈধ ট্রলার চলাচলের বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভোলা নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় জানান, মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি ‘ডেঞ্জার জোন’। বর্তমানে ডেঞ্জার জোন চললে। সেখানে সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় ট্রলার চলছে কি-না সে বিষয়ে জানা নেই। বিষয়টির খোজখবর নেওয়া হবে। যদি ট্রলার চলে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এতদিন কেন খোঁজ-খবর নেননি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাকে কেউ জানাননি।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান বলেন, আগের ইজাদারের মেয়াদ শেষ হয় এপ্রিল মাসের শেষের দিকে। এর আগে সি-ট্রাকটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে সি-ট্রাকটি আগের ইজারাদার আমাদের কাছে বুঝিয়ে দিতে দেরি করেছেন। আগের ইজারাদার সি-ট্রাকের ইঞ্জিন পরিবর্তন করে চালিয়েছেন। আগের ইঞ্জিন এখনো সচল হয়নি। বিকল্প একটি সি-ট্রাক দেওয়া হবে, নতুন ইজারাদার সেটি চালাবেন। আশা করি, শিগগির সি-ট্রাকটি চালু করা হবে।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ