হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গোল্লাছুট ও কানামাছি খেলা

মো. মাহে আলম মাহী ॥
একসময় বিকেল হলেই ভোলার বিভিন্ন গ্রামের খোলা মাঠ, স্কুলের প্রাঙ্গণ কিংবা বাড়ির উঠান ভরে উঠত শিশু-কিশোরদের কোলাহলে। দল বেঁধে চলত দৌড়ঝাঁপ, হাসি-ঠাট্টা আর প্রতিযোগিতা। সেই সময়ের দুই জনপ্রিয় খেলা ‘গোল্লাছুট’ ও ‘কানামাছি’ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ভোলা সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ গ্রামে নিয়মিত গোল্লাছুট খেলার চর্চা নেই, স্কুলের মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবলের আধিক্য, উঠানভিত্তিক খেলাধুলা প্রায় বন্ধ।
ভোলা সদরের চর জাংগালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ আবি আবদুল্লাহ বলেন, সাত-আট বছর আগেও টিফিনের ছুটির সময়ে বাচ্চারা ‘গোল্লাছুট’ ও ‘কানামাছি’ খেলত। এখন বেশিরভাগই মোবাইল গেম নিয়ে ব্যস্ত। গোল্লাছুট ছিল সম্পূর্ণ দলীয় খেলা। এতে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশল ও সমন্বয় প্রয়োজন হতো।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, এই খেলায় শিশুদের নেতৃত্বগুণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, দলগত চেতনা গড়ে উঠত স্বাভাবিকভাবেই। কানামাছিতে একজনের চোখ বেঁধে দেওয়া হতো, আর অন্যরা শব্দ করে তাকে বিভ্রান্ত করত। এই খেলায় মনোযোগ বৃদ্ধি পেত, শ্রবণশক্তি ও প্রতিক্রিয়া দক্ষতা বাড়ত, পারস্পরিক আস্থা তৈরি হতো।
ভেলুমিয়ার এক প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল খালেক মিয়া জানান, আমাদের সময় আমরা প্রত্যেকদিন বিকালে বাড়ির উঠানে কানামাছি খেলতাম আর এখনকার বাচ্চারা নামই জানে না। এ বিষয়ে কথা হয় ভোলা জেলার একাধিক ক্রীড়া সংগঠক এর সাথে তাঁরা বলেন, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা শিশুদের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাঠের খেলায় শারীরিক সুস্থতা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি মানসিক বিকাশও ঘটে। স্ক্রিননির্ভর জীবনে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে বলে অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গ্রামীণ খেলাধুলা উৎসব আয়োজন না করলে এই ঐতিহ্য টিকবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে স্মার্টফোন ও অনলাইন গেমের বিস্তার, খেলার মাঠ কমে যাওয়া, শিক্ষার অতিরিক্ত চাপ, অভিভাবকদের নিরাপত্তা উদ্বেগসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের গ্রামবাংলা থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা।
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব খেলাগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঐতিহ্যবাহী খেলা অন্তর্ভুক্ত করা, উপজেলা পর্যায়ে গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে খেলাধুলা উৎসব পালন, অভিভাবক সচেতনতা কার্যক্রমসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে বলেও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা। গোল্লাছুট ও কানামাছি শুধু খেলা নয় এগুলো ছিল গ্রাম বাংলার শৈশবের প্রাণ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে ঠিকই, তবে শিকড়কে ভুলে নয়। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায়ই কেবল এসব খেলার নাম পড়বে।
