জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৬৩

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : তার পক্ষ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে এ বিষয় এম. রহমান আর অগ্রসর হয় নি। মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর পরই এম.ফিল গবেষণায় যোগদান করেন। কর্ম জীবনের সন্ধানে চাহিদা অনুপাতে চাকুরী না হওয়ায় চেষ্টা অনবরত চলতে থাকে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে ইউনিভার্সিটির ১৯৯ তম সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাত্র ২৭ বছর বয়সে এম রহমান “এম.ফিল অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন। যা এক বিরল সাফল্য। এ দীর্ঘ সময়ে মিস নিপা হারিয়ে যাওয়ার পালা। হারিয়েও হারায়নি। সে এক অন্য কাহিনী। হালকা প্রেম আর ভালবাসা, তারই মাঝে অন্তরঙ্গ বন্ধু, সেই থেকে বিয়ে (২০০৬ সাল) চাকুরী জীবনের সহকর্মী বি.হোসেন মাস্টার নামের এক শিক্ষকের সাথে। মন দেয়ানেয়া থেকে উভয়ের ইচ্ছার ভিত্তিতে, পিতা-মাতার অজান্তে প্রেমের মোহে উভয়ের সিদ্ধান্তক্রমে বিয়ে হয় বি.হোসেন মাস্টারের সাথে। মিস নিপার পিতা জানতে পেরে তাদের বিয়ে মেনে না নিয়ে এক পর্যায়ে নিপার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায়। এক পক্ষ হয়ে নিপার পরিবার নিপা কর্তৃক ডিভোর্স লেটার পাঠায়। বি.হোসেন সাহেব শত চেষ্টা করেও বিবাহ বন্ধন ধরে রাখতে পারে নি।
এদিকে বি.হোসেন সাহেব প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে, বিরহ, বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ঘুম, নাওয়া, খাওয়ার অনিয়ম তার জীবনে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। একে একে দু’বার হারানোর বেদনা তাকে ব্যথিত করে তুললো। শহরের মুসলমান পাড়ায় নিপার বাসার আশ-পাশে দাঁড়িয়ে আপন মনে গান গায়–

ও- তুই যারে আঘাত হানিলি রে মনে,
সে জন কি তোর পর-
সে যে তোরি তরে কেন্দে কেন্দে বেড়ায় দেশান্তর,
ওরে বন্ধু সে জন কি তোর পর

শিল্পী আসিফের কণ্ঠে-

ও প্রিয়া ও প্রিয়া তুমি কোথায়,
ভুল না হয় আমার ছিল বেশী,
কখনও ক্ষমা কর নি তুমি
একবার বলে দাও কেন আমার হলে না…..

প্রতীক্ষার গান

নয়ন যদি রইবে বেঁচে তোমার পানে চাইব গো।
কইতে কথা পারব যদি তোমারই গান গাইব গো।
জীবন গেলে পাই না তবু, রূপ সাগরের রতœকে,
সে আলোকের ঝরণা ধারায় একলা আমি নাইব গো।
নয়ন যদি রইবে বেঁচে তোমার পানে চাইব গো।

এভাবে দীর্ঘ তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বি. হোসেন সাহেব অন্য মেয়ে বিয়ে করে সন্তানাদি নিয়ে সংসার জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিস নিপার অদ্য (২০১২ সাল জুলাই মাস) বিয়ে হয় নি। হাজারো চিন্তা চেতনা, ঘাত-প্রতিঘাত ও হেয় প্রতিপন্নের যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে নিপাকে। পারিবারিক চাপ ও নিজের চাহিদা অনুযায়ী পাত্র না পাওয়া, পাড়ার প্রতিবেশীদের হাজারো মন্তব্য, সব মিলে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। যা নিপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ দিন দিন মানসিক যন্ত্রণা তাকে ব্যথিত করে তুলছে। কারো নিকট প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যার ব্যথা সে-ই জানে। কবির ভাষায়-

ব্যথিতের বেদন বুঝিতে পারে,
কি যাতনা বিষে,
বুঝিবে সে কিসে
দংশেনি যারে।

যৌবনের গান যখন উত্তাল তরঙ্গ তুলে সাগরের মত ঢেউ নিয়ে তার হৃদয় এসে দাঁড়াল। যে উত্তাল তরঙ্গ নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, শত-প্রাচীরের বাঁধা উপক্ষো করে নিজের গতিতে চলে। যৌবন যে কোন সমাজ মানে না, বাধা মানে না, সকল বিঘ্ন-বিপত্তি অতিক্রম করে চলে, এ কথা নিপা ভুলেই গিয়েছিল। ঠিক তখনই তাকে একাকী বিয়ের এ দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হলো। এমনি এক চরম মুহূর্তে হিমালয়ের মত ধূসর মেঘ বিশাল এক হুংকার নিয়ে তার গতিরোধ করে দাঁড়াল। যার ফলে হাসি মাখা মুখ মলিন হলো, আজ ৮টি বছর। কে ফুটাবে হাসি আছে কার হিম্মত। বিধাতার লিখন না যায় খন্ডন। হারানো হাজারো স্মৃতি নিয়ে নিপা একাকী অব্যক্ত বেদনার গান গেয়ে বেড়ায়–

কি ছিলে আমার বল না তুমি,
আছি তো আগেরি মতো
এখনো আমি (২)
ভুলে কি গেছ তুমি আগেরি সে কথা,
আজও তা রয়েছে আমার স্মৃতিতে গাঁথা (২)

তুমি কি আগেরি মতো এখনো হাসো,
তুমি কি তেমনি করে আমায় ভালবাস।
কি ছিলে আমার বল না তুমি,
আছি তো আগেরি মতো
এখনো আমি (২)

যার কপালে যা লিখা আছে বিধির ঐ কলমে, দুঃখ কাঁদলে কি আর যায়? যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। কান্নায় শোক কমে, তাই বলে দার্শনিকের কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দার্শনিকের উক্তি- ভাবিতে উচিৎ ছিল প্রতিজ্ঞা যখন। এতক্ষণে এম. রহমান ডিগ্রি কলেজের (ডিগ্রি নন এমপিওভুক্ত) লেকচারার পদে যোগদান করে একই সাথে কুষ্টিয়া ইউনিভার্সিটিতে পি-এইচ.ডি. রিসার্চে (গবেষণায়) যোগদান করেন। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক হচ্ছেন প্রফেসর ড. এম. মুজাম্মিল আলী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত এবং অমায়িক শিক্ষক তিনি।
এম. রহমানের এত অল্প বয়সে এম.ফিল অ্যাওয়ার্ড লাভ এবং পি-এইচ.ডি. ফেলোশীপে দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে প্রফেসর সাহেব তাঁর নিকট মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরোক্ষ প্রস্তাব করেন। মেয়ে “মুফা” খুব মেধাবী ছাত্রী। ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে মেধাবৃত্তি প্রাপ্ত। এস.এস.সিতে গোল্ডেন প্লাস পেয়ে ২০১০ সালে তখন ইন্টারমিডিয়েট অধ্যয়নরত। দেখতে সুন্দরী মেয়েদের সাথে শতভাগ না মিললেও সুন্দরীদের তালিকায় প্রথম স্তরে আছে। তবে পূর্বে বর্ণিত খাটো ও লম্বার দুটি গুণের কথা বলা হয়েছে। তার একটি তার মধ্যে নেই। অল্প বয়স অন্য দিকে পড়াশুনা কেবল শুরু এ জন্য এম. রহমান তাৎক্ষণিক সময় নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এতক্ষণেও নিপার বিয়ে হয় নি। ২০১২ সালের জানুয়ারী মাস নিপার ভাগ্যের পরিবর্তন স্বরূপ চাকুরীর পরিবর্তন হয়ে নতুন চাকুরী এজি অফিসের অডিটর হিসেবে যোগদান করে।

(চলবে————-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।