জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৫৬

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : মেঘালয় : মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুর গিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হোটেল ফরচুনায় উঠলাম। হোটেলটা মন্দ ছিল না। দেখে পছন্দ হলো। কিছু নাস্তা খেয়ে শহর দেখতে বের হলাম। টুইন টাওয়ার দেখলাম যা আমেরিকা নিউইয়র্কে দেখেছিলাম। আমেরিকার টুইনটাওয়ার আরো বিশাল আরো অনেক বড়। রাজার বাড়ী দেখলাম, অপরূপ কারুকার্য খচিত জাকজমক পূর্ণ কত ঐশ্বর্য থাকলে কুয়ালালামপুরের রাজা তার বিরাটত্ব প্রকাশ করছে। কোন নিপুণ শিল্পী কতদিনের পরিশ্রমে তার কল্পনায় এ রূপ দিয়েছে। ঘুরে ফিরে অনেকক্ষণ দেখলাম বিশাল বাড়ীটাকে। হাইকোর্টও অনেক বিশাল, অনেক কারুকার্য খচিত।
দূর থেকে পার্লামেন্টের কিছু কিছু অংশ দেখলাম। সত্যি এরা নিজের দেশকে কত ভাল বাসে। নিজের ছেলে মেয়ের মত মায়া মমতায় স্নেহ, ভালবাসায় আপন করে একে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছে। এয়ারপোর্টটা আরো অপরূপ মন ভুলানো। বসলে এয়ারপোর্ট ছেড়ে প্লেনে উঠতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় সারা জনম ঐ এয়ারপোর্টের সৌন্দর্যের দিক তাকিয়ে থাকি। তবুও প্লেনের এলাউন্সমেন্ট শুনে প্রত্যেক যাত্রীই প্লেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের সিট দখল করে বসে পড়ে। পৃথিবীটা কত সুন্দর, কত মনোরম ও মনোহর অপরূপের এক রূপ কথার দেশ। কুয়ালালামপুরের সুন্দর সুন্দর বিখ্যাত জায়গাগুলি দেখে হোটেলে এসে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে উঠে নাস্তা খেয়ে গাড়ী ভাড়া করে গ্যাংটিনের পথে পাড়ি জমালাম। প্রায় দেড় ঘন্টা লাগে গ্যাংটিনে যেতে। পথে কত বিখ্যাত মন্দির, গীর্জা দেখার মত অনেক কিছু ছিল। কিন্তু গতকালের সারা গাড়ীতে থাকার ক্লান্তিতে আর নেমে দেখতে মন চাইল না। আমরা গ্যাংটিনে পৌছে গেলাম। কিন্তু আগের মত গা বেয়ে উঁচুনিচু রাস্তা মেঘালয়ের ভিতর দিয়ে উঠার জায়গা পেলাম না। আমরা “কেবলে” চড়ার টিকিট কেটে, “কেবলে” চড়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলাম। কেবুলগুলো, এসে তড়িতে থামল, তাড়াতাড়ি করে আমার দুই ছেলে, দুই বৌমা ও আমি উঠে পড়লাম। “কেবল” কত রাজ্য ও নৈরাজ্য বন, বনান্তর, ঝোঁপ-ঝাপ, উঁচু ও নিচুতে দৌড়ে চলতে লাগল। মেঘের দেশে, মেঘ রাজ্যে, মেঘকন্যা এলোমেলো বিশাল চুল ছড়িয়ে দিয়ে ডাগর ডাগর চোখে যেন আমাকে হরিণ নয়না চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে। তার চোখ ঝলসানো মনমাতানো এসব দেখে তখন মনের খেয়াল হারিয়ে ফেলেছিলাম।
যখন একটি বিশাল প্রসাদে নামিয়ে দিল। তখন আমি দেখলাম যে, সাত বছর পূর্বে যে সৌন্দর্য দেখে টাকা পড়ে গিয়েছিল, এই প্রাসাদ টাকা তৈরীর একটি যন্ত্ররূপে আবিষ্কৃত হয়েছে। আসল সৌন্দর্যকে দুমড়ে মুচড়ে মেঘের রাজ্যে বিলীন করে দিয়েছে। মেঘ আর আগের মত হাতছানি দিয়ে কাছে টেনে নেয় না। প্রিয়া আর প্রিয়ের মিলনে, চুম্বনে, আলিঙ্গনে বুক ভরে দেয় না। বিশাল প্রাসাদ আর কাঁচের ফাঁকে মেঘকে দেখছি, কিন্তু একটু ছুয়ে দেখতে পারি নি। আমাকে আর মেঘ ঢেকে দেয় না। প্রকৃতি বিশাল সৌন্দর্যকে প্রাসাদের কারিগর কাঁচের দেয়ালের ভিতরে ভিতরে বন্দি করে রেখেছে। জানি না কোন রাজপুত্র যদি মরণ কাঠি জিয়ন কাঠি বদল করে এই ঘুমন্ত মেঘালয়কে জাগিয়ে তুলতে পারে।
ম্যাগডোনালে খেতে গেলাম। হঠাৎ আমার চোখে সুদিনকে দেখলাম, তেমনি সুন্দর ফর্সা, সুন্দর, সুন্দর ডাগর ডাগর চোখ, টিকালো নাক। চুলে কিছুটা পাক ধরেছে। আমাকে দেখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো। বললো, আরে তুমি এখানে? কোথা থেকে? বললাম, সিঙ্গাপুর থেকে। তুমি ? বলল- খুলনা থেকে এতদূর এসেছ? কেমন আছ? এই সুদিন দৌলতপুর কলেজে বি.এ পড়ছিলো। আমি তখন বি,এ সেকেন্ড ইয়ারে অনার্স পড়ছিলাম। নীলাও আমাদের সাথে অনার্সের ছাত্রী ছিল। অপূর্ব সুন্দরী লম্বা ফর্সা বড় বড় হরিণ নয়না চোখ। বাগেরহাটের সদর মহকুমা অফিসারের মেয়ে ছিল। সুদিনের সেই অনাকাংখিত সাক্ষাৎ আমাকে পুরানো ইতিহাস স্মরণ করিয়ে ব্যথিত করে তোলে। আমি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সভাস্থল থেকে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমার আনমনা ভাবমূর্তি ছেলে ও বৌমাকে আবেগ তাড়িত করে তোলে। নতুন পরিবেশ পুরনো স্মৃতিকে ম্লান করে দেয়। কিন্তু নতুন স্মৃতিচারণ তাকে পুনর্জীবিত করে। ইতমধ্যে আমার মনে পড়ে যায় একটি গানের কথা-আজ দু’জনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।