সরেজমিন ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ আবুল কালাম সাংসারিক জীবনে অভাব-অনটনের কারণে স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ৪০ বছর পূর্বে পরিবার নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকার শেরে বাংলা নগর এলাকায় একটি ভাতের হোটেল দেন এবং সেখানেই একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন শাহাবুদ্দিন। শেরে বাংলা নগর এলাকাতেই বেড়ে ওঠেন শাহাবুদ্দিন। মাঝে-মধ্যে গ্রামের বাড়ীতে এসে বাড়ী-ঘরসহ জমি-জমা দেখাশুনা করতেন শাহাবুদ্দিনের পরিবার। বড় হতে থাকেন শাহাবুদ্দিন। আর্থিক অচ্ছলতার কারণে বেশি দূর পড়া লেখা করতে পারেননি। পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে বেছে নেন গাড়ী চালানো পেশায়। সিএনজি চালিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে থাকেন। কয়েক বছর পর স্ত্রী হালিমা বেগমের সাথে বিয়ে করেন শাহাবুদ্দিন। সে ঘরে জন্ম নেয় ২ কন্যা সন্তান। যার একজনের নাম লামিয়া, অপরজনের নাম সানজিদা। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালই চলছিল তাদের সংসার। সন্তানের লেখা-পড়াসহ সাংসারিক খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাবার ছোট ভাতের হোটেলের পাশাপাশি শহাবুদ্দিনের সিএনজি চালিয়ে যা ইনকাম হয়, তা দিয়েই কোনমতে চলছিল সংসার। ঢাকায় থাকার কারণে শাহাবুদ্দিনের পরিবারের ভোলায় তেমন একটা আসা হতো না তাদের। তবে মাঝে-মধ্যে এসে ভোলায় এখানকার গ্রামের বাড়ী ও অন্যান্য জমি-জমা দেখে যেতেন তারা। বাবার হোটেল ব্যবসা আর শাহাবুদ্দিনের সিএনজি চালানের অর্থ থেকে কিছু টাকা জমিয়ে ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ৯নং ওয়ার্ডে বাড়ী করেন। এভাবেই চলছিল তাদের সংসার।

কিন্তু পুরো পরিবারের উপর অন্ধকার নেমে আসে স্বৈরাচার, ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন সেই দিন বিকেলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনা পালিয়ে দেশ ত্যাগের দিন সারাদেশে বিজয় মিছিল আর আন্দন উল্লাসে মাতেন গোটা দেশবাসী। সেই বিজয় ও আনন্দ মিছিলেও গুলি চালায় তৎকালীন সময়ের স্বৈরাচার শেখ হাসিনার মদদপুস্ট প্রশাসন। সেই দিন বিকেলে অন্যান্যদের মত বিজয় মিছলে যান শাহাবুদ্দিনের বাবা আবুল কালাম। ঘরে বসে থাকেননি শাহাবুদ্দিনও। তিনিও যান বিজয় মিছিলে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ঢাকার শেরে বাংলা নগর এলাকায় বাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা এগিয়ে চৌরাস্তার সেই বিজয় মিছিলে যাওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরই পুলিশের ছোড়া গুলিতে শহীদ হন শাহাবুদ্দিন। পুলিশের গুলিতে তার দেহ এফোর-ওফোর হয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শাহাবুদ্দিন। তাজা রক্তে ভিজে যায় পিজঢালা রাজপথ। শাহবুদ্দিনের মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে তার ছোট বোন সাথি আক্তার ছুটে যান ঘটনাস্থলে। সেখান থেকে ভাইর রক্তাক্ত দেহ নিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে পরবর্তীতে নিউরোসাইন্স হাসপাতালে নেয়া হয়। এদিকে শাহাবুদ্দিনের এ খবর পেয়ে তার বাবা, স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ছুটে যান হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে রাত ৮টার দিকে মৃত্যু বরণ করেন শাহাবুদ্দিন। এ সময় স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সময় দেশের পরিবেশ এতটাই খারাপ ছিল যে বেশিক্ষণ তারা হাসপাতালে থাকতে এবং সেখানে কান্না-কাটি করতে পারেননি। পরবর্তীতে তাকে হাসপাতাল থেকে তার পরের দিন ৬ আগস্ট ভোলা গ্রামের বাড়ীতে এনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে জুলাই অভ্যুত্থান আন্দোলনে গোটা বাংলাদেশের মধ্যে ভোলা জেলা থেকে ৪৮ জন শহীদ হন। এর মধ্যে ভোলায় ১জন ছাড়া বাকি সবাই দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হন। সেই সব শহীদদের ৪৭ জনের নাম সরকারি তালিকাভুক্ত হলেও অজ্ঞাত কারণে শাহাবুদ্দিনের নামটি এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি। ঢাকার গোয়েন্দা রিপোর্ট-এ শাহাবুদ্দিনের পরিবার আওয়ামীলীগ ঘেষা বলে উঠে এসেছে। কিন্তু ভোলার গ্রামের বাড়ীর এলাকার লোকজন বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন শাহাবুদ্দিন কখনোই কোন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল না।
শহীদ শাহাবুদ্দিনের মা মনোয়ারা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যেদিন দেশ থেইক্যা পালাইছে, হেই দিন বিকালে বিজয় মিছিলে গেছিল শাহাবুদ্দিন। তখন পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। শাহাবুদ্দিন মারা যাওয়ার পর প্রায় দেড় বছরের মত সময় গেলেও আমার ছেলের নামটি গেজেটভুক্ত হয় নাই। তাই আমি সরকারের কাছে শাহাবুদ্দিনের নামটি গেজেটভুক্ত করার দাবী জানাচ্ছি। পাশাপাশি যারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তাদের বিচার চাই।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদের ঈমাম মাওলানা ইয়াছিন বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখে রাত ৮টার দিকে ঢাকায় হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে এমন একটি খবর আসে আমার কাছে। তারা আমাকে বলে শাহাবুদ্দিন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আপনি কবর রেডি করেন, আমরা আসতাছি। তখন আমি তার আত্মীয়-স্বজন যারা আছে তাদের খবর দেই। পরদিন সকাল ৮টার দিকে লাশ চলে আসে। তখন স্থানীয় ইউনিয় বিএনপির সভাপতি-সম্পাদকসহ শত শত লোকের উপস্থিতিতে জানাযা শেষে তাকে দাফন করা হয়। তিনি আরো বলেন, ৫ তারিখে পুলিশের গুলিতে শাহাবুদ্দিনের মত অনেক লোক শহীদ হয়েছে। আমি সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি যাতে শাহাবুদ্দিনের নামটি গেজেটভুক্ত করা এবং শহীদি মর্যাদা দেয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা নজির, ইউসুফ ও ইয়াছিন বলেন, শাহাবুদ্দিন খুব ভাল ছেলে ছিল। সে ঢাকায় সিএনজি চালাইত। সে কখনো কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। ভোলার যারা শহীদ হয়েছে তাদের সবারই নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু কি কারছে শাহাবুদ্দিনের নামটি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না আমাদের জানা নেই। আমরা সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি তার নামটি যেন সরকারি তালিকাভুক্ত হয় এবং তাদের পরিবারের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়, যাতে করে তাদের পরিবারটি একটু ভালোভাবে চলতে পারে।

শাহাবুদ্দিনের বোন ফাতেমা বেগম বলেন, হাসিনা যেদিন পালাইছে সেদিন সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে একটি বিজয় মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে আমার বাবা ও ভাই অংশগ্রহণ করে। বাবা ফিরে আসে কিন্তু ভাই শাহাবুদ্দিন ফিরে আসে না। তখন আমাদের কাছে খবর আসে শাহাবুদ্দিন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। আমরা খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে দেখি পুলিশের একটি গুলি ভাইর মাথায় লেগে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যায় এবং মাথার মগজ বের হয়ে পড়ে। তখন বিজয় মিছিলে অংশগ্রহণকারী এবং আমার ছোট বোন তাকে নিয়ে প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে নেয়। সেখান থেকে নিউরোসাইন্সে নেয়ার আধাঘণ্টা পরই তার মৃত্যু হয়। পরে তাকে ৬ আগস্ট গ্রামের বাড়ীতে ভোলার চরসামাইয়ায় এনে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর দেড় বছর অতিবাহিত হলেও এখনও গেজেটভুক্ত হয় নাই। আমরা বর্তমান ড. ইউনুছ সরকারের কাছে ভাইর নামটি গেজেটভুক্ত করার দাবী জানাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার শহীদের রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সেই সরকার আমার ভাইর নামটি এখনও গেজেটভুক্ত করে নাই। আমার ভাই কোন রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল না। কিছু মানুষের হাছা-মিছা কথা শুনে, সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমার ভাইয়ের নামটি বাদ দেয়া হয়েছে। ভোলার এত লোক শহীদ হয়েছে তাদের সকলকে শহীদি মর্যাদা দেয়া হয়েছে, কিন্তু আমার ভাইকে শহীদি মর্যাদা দেয়া হয় নাই। কেন দেয় নাই ? দেশের জন্য আমার ভাই জীবন দিয়েছে এটাই কি তার অন্যায় ? দেশে তো দেশের জায়গায় রইল, কিন্তু আমার ভাইতো রইল না। এখন আমরা সরকারের কাছে একটাই দাবী যেন আমার ভাইর নামটি সরকারি গেজেটভুক্ত করে এবং শহীদ পরিবারের পাশে থাকে।
তিনি আরো বলেন, ৫ আগস্ট যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, যারা যারা এই গণহত্যার সাথে জড়িত, স্বৈরাচার ও খুনি শেখ হাসিনাসহ তার দোসরদের যেভাবে মানুষের উপর গুলি করে হত্যা করেছে, আমরা তাদের সর্বোচ্চ ফাঁসির দাবী জানাচ্ছি। বাংলার মাটিতে এবং শহীদ পরিবারের সামনে যেন তাদের বিচার হয়।
শহীদ শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী বিবি হালিমা বলেন, আমার স্বামী একজন সিএনজি চালক ছিলেন। তিনি ৫ তারিখে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। পরিবারে তিনিই আমাদের একমাত্র উপার্যনাক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। সন্তানসহ অন্যান্য সকল খরচ তিনিই বহন করতেন। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, জুলাই আন্দোলনে আমার স্বামী শহীদ হয়েছে। কেন শহীদের তালিকায় তার নামটি উঠে নাই ? তিনি তো কোন দল করতেন না। যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই।
একটি অভিযোগ উঠেছে যে আপনাদের পরিবার আওয়ামীলীগ ঘেষা, তার জন্যই নামটি সরকারি তালিকাভুক্ত হয় নাই বা তালিকাভুক্ত হতে দেরী হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি কখনো কোন দিন কোন মিছিল-মিটিংএ যায় নাই। তার কাজই ছিল সিএনজি চালানো। পরিবারে একটু সুখের জন্য, দিনে এবং রাতে সিএনজি চালাইতো। আমার বিয়ের এত বছর হয়েছে কখনোই দেখিনাই তিনি কোন মিছিল-মিটিংএ যাইতে। আপনারা তদন্ত করে দেখতে পারেন। আপনার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন কি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বিয়ের ১৭/১৮ বছর চলছে, তখন থেকে দেখেছি ওনারা ঢাকায় ব্যবসা করছে, কর্ম করেছে। পোলা পাইন মানুষ করার চেষ্টা করেছে। তারা কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না।
আপনারা সরকারী কিংবা বেসরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রথমে জামায়াতে ইসলাম থেকে ২ লাখ, তারপরে আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে ১ লাখ টাকার একটি চেক, জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকার একটি চেক পেয়েছি।

শহীদ শাহাবুদ্দিনের পিতা আবুল কালাম বলেন, আমার ছেলে শাহাবুদ্দিন মারা যাওয়ার পর অনেক জায়গায় দৌড়া-দুরি করেছি, কিন্তু আমার ছেলের নামটা গেজেটভুক্ত হয় নাই। জুলাই আন্দোলনে ভোলার ৪৮ জন শহীদ হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৭ জনের নাম সরকারি গেজেটভুক্ত হয়েছে, কিন্তু একমাত্র আমার ছেলের নামটি-ই গেজেটভুক্ত হয় নাই। আমরা অসহায় পরিবার, সরকারের কাছে একটাই দাবী, আমার ছেলের নামটা যেন সরকারী গেজেটভুক্ত করে। তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনে যাদের কারণে আমার মত হাজারো পিতার বুক খালি হয়েছে, তাদের উপযুক্ত বিচার দাবী করছি। আমরা তাদের ফাঁসি চাই।
জুলাই আন্দোলনে শহীদদের নামের তালিক প্রস্তুত করণের লক্ষে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ভোলায় যে কমিটি রয়েছে সেই কমিটির অন্যতম সদস্য হচ্ছে সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসক। কি কারণে শাহাবুদ্দিনের নামটি সরকারি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না সেই ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো: আজাদ জাহান এবং সিভিল সার্জন ডা: মনিরুল ইসলামের সাথে কথা বললে তারা উভয়ই একই সুরে কথা বলেন। তারা বলেন, শাহাবুদ্দিনের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে তারা আওয়ামীলীগ ঘেষা পরিবার। যেহেতু শাহাবুদ্দিন ঢাকায় মারা গেছেন, তাই সেখানকার তদন্ত রিপোর্টে বিষয়টি নেগেটিভ এসেছে। তারপরেও পুনরায় ঢাকা এবং ভোলা থেকে তদন্ত করা হয়েছে। সেই রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন সেখান থেকে যেটা হয়, তাই হবে। এতে আমাদের কিছুই করার নেই।
এদিকে ভোলার সচেতন মহল মনে করছেন শাহাবুদ্দিন যেহেতু জুলাই আন্দোলনে মারা গেছে, তাই তার নামটি সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত করা এবং তার পরিবারের প্রতি সরকার সহানুভূতির দৃষ্টি দিবে। যাতে করে শাহাবুদ্দিনের পরিবার কিছুটা হলেও সান্তনা পাবে এবং সরকারি-বেসরকারী যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলো যেন পায়। তা হলে কিছুটা হলেও শাহাবুদ্দিনের পরিবার ঘুরে দাড়াতে পারবে।