ভোলার তজুমদ্দিনে আশ্রমে আসা নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষনের অভিযোগ ॥ আটক-৩
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৫৪

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : হাসি : সে বলল- বিদেশীকে দেখলে আমার বুক কাঁপে, আমি পালিয়ে যাই। পদ্মা আরো বললো, এই যে নীল, লাল, পাল তুলে জেলেরা ঘুরে ঘুরে মাছ ধরছে। ওদের নৌকায় করেই আমার আকাশীকে নিয়ে বিদেশী পালিয়ে গেল। আমি যেন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আকাশী ? সে আবার কি নাম ? পদ্মা বলল- হ্যা, আকাশী, এই আকাশের মত সে সুন্দর। মেঘ রংয়ের শাড়ী পড়ে সে পদ্মার পাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াত। আলুলায়িত কুন্তল কেশ ছড়িয়ে নদীর পারে পারে সে কুড়াত পাথরের নুড়ি, বসে থাকত বড় শিলা খ-ের উপর, নদীর জলে পা ছড়িয়ে চেয়ে থাকত নীল আকাশের দিকে।
আকাশী নাম রেখেছিলাম বলে সে যেন আকাশকে বড় ভালবাসত। আর আকাশী রংয়ের শাড়ী পরত। চুড়ির রংও ছিল আকাশী। সূর্যের মত গায়ের রংয়ের সাথে আকাশী রংয়ের চুড়ি তাকে বড় মানাত। এক বিদেশী প্রায়ই আসত এই ব্রীজের উপর। ভাবতাম হয়ত ব্রীজ দেখতে এসেছে অথবা জেলেদের নৌকা দেখতে এসেছে। আকাশী ওকে দেখে রিনিঝিনি করে হেসে উঠত। সে হাসির শব্দে ব্রীজের লোহা লক্কড়গুলি ঝনঝন করে বেজে উঠত। বিদেশী তরতর করে ব্রীজ দিয়ে নেমে এসে আকাশীর কাছে এসে দাঁড়াত। আকাশী আড়চোখে তার পানে চেয়ে দেখত। বিদেশী বলত, কে কে তুমি ? আকাশী বলত, আমি আকাশী। আকাশী খিল খিল করে হেসে উঠত। বিদেশী উন্মাদ হয়ে গেল। এত সুন্দর মানুষ হাসতে পারে? এ হাসি মানুষের নয়, এ হাসি কোন স্বর্গের দেবীর। বিদেশী আসত আকাশীর কাছে, কত বনফুলের মালা নিয়ে। দু’জনে পদ্মার জলে পা ডুবিয়ে চেয়ে থাকত সীমাহীন অথই পানির দিকে। হারিয়ে যেত মন যৌবন। দু’জন দু’জনকে ভালবাসল। বিদেশী ছিল একজন জ্ঞানী তুখোড় ছেলে। পদ্মা কোনদিন ভাবে নি যে ছেলে এত ভাল- সে এমন একটি কাজ করতে পারে। দু’জন পদ্মার পারে হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াত। পদ্মা কোন দিন না করে নি। পদ্মা ভাবত বেড়াক না, সঙ্গী সাথীহীন পেয়েছে একজন সাথী- থাক না একটু আনন্দে।
দু’জনে হাসত, কথা বলত। রাত নেই, দিন নেই। কথার বিরাম নেই। স্রোতের মত চলছে সে কথা। যৌবন যে কোন সমাজ মানে না। বাধা মানে না, বিঘ্ন বিপত্তি মানে না, এ কথা পদ্মা ভুলে গিয়েছিল। মা হয়ে স্নেহের প্রবল আকর্ষনে সব কিছু তলিয়ে দেখবার সময় তার ছিল না। সে দিনটার কথা আজও পদ্মার মনে পড়লে গা কেঁপে উঠে, মাথা ঘুরে যায়। শরতের স্বচ্ছ আকাশ, ভাদ্রের মাতাল করা পদ্মার বুকে জলের উচ্ছ্বাস, জালে স্রোত কলকল ছলছল করে বয়ে চলছে জানা অজানার দেশে। সেকি উচ্ছ্বাস! যেন ভেঙ্গে চুরে গুড়ো করে ছুটে যাচ্ছে, মিলনের গানে। আকাশী ও বিদেশী তা দেখে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আকাশে সেদিন বড় করে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল। মুগ্ধ নেত্রে দু’জনে সে চাঁদের পানে চেয়ে চেয়ে পাগল হয়ে গেল। ভুলে গেল বর্তমান, ভবিষ্যৎ, অতীত। আস্তে আস্তে বিদেশী উঠে দাঁড়াল, আকাশীও তার চোখের পানে চেয়ে চেয়ে উঠে দাঁড়াল। বিদেশী একটা পাল তোলা নৌকায় আকাশীকে নিয়ে উঠে পড়ল।
আকাশী একটুও আপত্তি করল না। যেন কোন চুম্বকের প্রবল আকর্ষণে তার পিছু নিল। রিনিঝিনি করে হেসে উঠল। সে হাসির শব্দে ভাদ্রের পাগল করা শরতের জ্যোৎস্না ভরা আকাশটাও হেসে উঠল। ঘুমন্ত পদ্মাও যেন চেতনা পেয়ে জেগে উঠল- শুধাল কে কে এমন করে হাসে ? এসে দেখল পদ্মা- পদ্মার পাড়ে কেউ নেই। শুধু নির্জন নদীর শুন্য পাড়টা খা খা করছে। পদ্মা কেঁদে উঠল, চিৎকার করে ডেকে উঠল। আকাশ- আকাশী, ওরে আয়, আয়, ফিরে আয়, একবার ফিরে আয়, মা একবার ফিরে আয়। কোথায় আকাশী, আর কোথায় বিদেশী। শুধু শুন্য নদীর পাড়ে ভাদ্রের কাঁশবনের কাঁশফুলগুলো রিনিঝিনি করে হেসে উঠল।
(চলবে———)
