মনিরুজ্জামান/ইকবাল হোসেন ॥ ভোলার বোরহানউদ্দিনে একই দিনে এক রোগীর পূর্ণ রক্তগণনা পরীক্ষায় (সিবিসি) তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করা হলে তিন ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে। ভিন্ন ফলাফল আসায় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন চিকিৎসক, রোগী ও তার স্বজনরা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ডাক্তারগণ মনে করছেন, ডায়াগনস্টিক যন্ত্রের মান, ব্যবহার করা রিএজেন্ট এবং ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভিজ্ঞতার পার্থক্য এই বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
উপজেলার গঙ্গপুর ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সামছুদ্দিন (২৮) জানান, তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। ২৬ অক্টোম্বর তিনি হাসপাতালে আসেন। বর্ণনা শুনে ডাক্তার ডেঙ্গু টেস্ট দেন। রিপোর্ট পজেটিভ আসায় রাতে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসক পস্নাটিলেটের পরিমান জানতে পূর্ণ রক্তগণনা পরীক্ষা (সিবিসি) করতে বলেন। ২৭ অক্টোবর হাসপাতাল গেটের সামনে অবস্থিত নিউ জনসেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করালে রিপোর্টে পস্নাটিলেটের পরিমান ৫৫ হাজার পাওয়া যায়। এরপর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে চিকিৎসা দেন। প্রতিদিন পেস্নটলেট পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন। পরদিন (২৮ অক্টোবর) এসএস ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পুনরায় টেস্ট করান। রিপোর্টে পেস্নটলেট নেমে আসে ১৮ হাজার। এ অবস্থায় রোগির শারিরীক জটিলতা থাকার কথা। অথচ রোগী নিজেই শারীরিকভাবে অনেকটা ভালো অনুভব করছিলেন। এতে সন্দেহ হলে তিনি একই দিনে নিউ ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করান, যেখানে রিপোর্টে পেস্নটলেট দেখায় ৬৯, হাজার। সামছুদ্দিন বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে পূর্বের নিউ জনসেবা ডায়াগনস্টিকে আবার টেস্ট করতে বলেন। একই দিনে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে আবার পরীক্ষা করালে পেস্নটলেট আসে ১,৪৫ হাজার।
ভুক্তভোগী সামছুদ্দিন বলেন, আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আসলে কোনটা ঠিক। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে। আমি চাই প্রশাসন যেন এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম ঠিকভাবে তদারকি করে। তিনি জানান, ২৯ অক্টোবর বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড় নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সিবিসি করানোর জন্য বরিশাল যাচ্ছেন।
নিউ ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিকের টেকনোলজিস্ট তাহমিদ হাসান বলেন, আমাদের রিপোর্ট যাচাই-বাছাই করেই দেওয়া হয়েছে, কোন ভুল নেই। রোগীর পেস্নটলেট ৬৯ হাজারই ছিল, এটাই সঠিক। নিউ জনসেবা ডায়াগনস্টিকের টেকনোলজিস্ট মো. সেলিম দাবি করেন, আমরা ২৭ তারিখে রোগীর পেস্নটলেট পেয়েছিলাম ৫৫ হাজার, পরদিন টেস্টে পেয়েছি ১,৪৫,০০০। আমাদের রিপোর্টই সঠিক।
অপরদিকে এস এস মেডিকেল সার্ভিসের পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা সুদক্ষ টেকনোলজিস্ট দ্বারা স্যাম্পল সংগ্রহ করি। রোগীর পেস্নটলেট আমরা পেয়েছি ১৮,০০০ এটাই সঠিক।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. কে এম রেজোয়ানুল ইসলাম বলেন, পস্নাটিলেট ১৮ হাজার হলে রোগির যে সমস্ত সম্ভাব্য সমস্যা ও ঝুঁকি থাকে, এ রোগির ক্ষেত্রে সেটা ছিল না। একই দিনে একই রোগীর তিন ভিন্ন রিপোর্ট পাওয়া মান নিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন তোলে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশনের সভাপতি রিয়াজুল হক সুমন জানান, এটা অনাকাঙ্খিত। এতে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ কবরে। নির্ভুলতা বাড়াতে আমরা সচেস্ট হবো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান-উজ্জামান বলেন, বিষয়টি খুবই বিপদজনক। ভুল রিপোর্ট রোগির জন্য হুমকি বয়ে নিয়ে আসতে পারে। পূর্বেও আমরা অভিযান করছি। পুনরায় অভিযান চলবে। অনিয়মে দ্রম্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি শুনছি, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিদ্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা ও যাব। যাদের শর্তসমূহ পূরণ হয়নি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ