ভোলার তজুমদ্দিনে আশ্রমে আসা নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষনের অভিযোগ ॥ আটক-৩
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৪৯

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : ডাক্তার সাহেবের বাড়ীতে বেশ লোকের আসা-যাওয়া চলছে। মিসেস খাজা কতক্ষণ কান পেতে শুনলেন, তারপর একগ্র মনোভাবে শোনার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না। খুব কাছাকাছি বাড়ী হওয়ায় ওরা কোন সংবাদ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে নি। ঐ দিন রাত একটার সময় দরজায় জোরে কষাঘাত হতে মিস্টার খাজা দরজা খুললেন। দেখলেন তাদের পরিচিত এক কম্পাউন্ডার। তিনি বললেন, আপনাদের বাসায় হট ওয়াটার ব্যাগ আছে? খাজা সাহেব হট ওয়াটার ব্যাগটা কম্পাউন্ডারের হাতে দিয়ে বললেন, কি ব্যাপার এত রাতে? কম্পাউন্ডার বলল, বেগম সাহেবার ছেলে হয়েছে কিন্তু ফুল পড়ছে না।
মি. খাজা ভিতরে এসে মিসেস খাজার নিকট সব খুলে বলল, মিসেস খাজা সেই বাসায় গেলেন এবং সব প্রত্যক্ষ করলেন, ভদ্র মহিলা লম্বা হয়ে শুয়ে বিছানায় ছটফট করছে। দুইজন নার্স তার হাতে স্যালাইন দেওয়ার চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এরই মাঝে ভদ্র মহিলা বলছে- আমাকে একটু পানি সাও, না হয় শেষ বারের মত আমাকে একটু দুধ দাও। বিধবা বোনটি এক কাপ দুধ এনে মিসেস খাজার হাতে দিল। দু’তিন চামচ দুধ মিসেস খাজা তার মুখে দিল। দুধটা খেয়ে স্বামীকে কাছে ডাকল। নিজের হাতটা স্বামীর স্নেহ কোমল হাতে রাখল। আর তার চোখের উপর চোখ রেখে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ল। স্বামী মাথা নত করে প্রায় এক ঘন্টা তার কাছে বসেছিল। একটু চোখের পানিও ফেলল না। কিন্তু যখন দেখল তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেল। তখন সে চিৎকার করে কেঁদে বলছিল: তোরা শীঘ্রই আয়, তোদের মা তোদের ছেড়ে চলে গেছে। তার পরদিন বেলা দশটার সময় ভদ্র মহিলাকে কাফন পড়িয়ে গোরস্থানের দিকে চলল। ওহ। ছেলেমেয়েদের সে কি কান্না। মম আর মমর ভাইটাকে মিসেস খাজা বুকে জড়িয়ে রেখেছিল। তবুও তাদের কান্না থামে না। সেদিন ওদের কান্নায় বোধহয় স্রষ্টার আকাশ ও বাতাস কেঁদেছিল। আর কেঁদেছিল সারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
সুখে হোক দুঃখে হোক সময় চলে যায়। সে কারো জন্য থেমে থাকে না। মমের মা মরে যাওয়ার পর থেকে বাড়ীটা কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সারা বাড়ীটা থমথম করছে। ছেলেমেয়েগুলো পথে-ঘাটে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। মিসেস খাজার ইচ্ছা ছিল মম আর মুশুকে লালন পালন করে বড় করে তুলবে। কিন্তু মমের ফুফু ও চাচা আপত্তি করলেন। বললেন, না, সে কি করে হয়, এক পরিবারের সন্তান অন্য পরিবারে মানুষ হবে। মিসেস খাজার খুব মায়া মা হারা ছেলে-মেয়ে দুটির জন্য। মুখ খানা খুব করুণ, দেখলে বুকে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। আর তাছাড়া মিসেস খাজার মনটা এমনিতেই খুব দরদী। নিজের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে লালন পালনের দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন। আসলেই এটা মানব দরদের একটা পরাকাষ্টা দৃষ্টান্ত।
মুশু ও মম সব সময়ই মিসেস খাজার কাছে আসে। অনেক সময় না আসলে মিসেস খাজা ডেকে কাছে আনতেন। মিসেস খাজার ছেলে-মেয়েরাও তাদের খুব ভালবাসে। ছোট ভাই-বোনের মত স্নেহ-মায়ার চোখে দেখে। মম কারো নামই ভাল করে বলতে পারে না। শুধু জায়ীর নামটাই তার মুখে স্পষ্ট শোনা যায়। আর শোনা যায় চাচার কথা। মি. খাজাকে মম চাচা বলে ডাকত। মমদের বাগানটা খুব মৌসুমী ফুলে ছেয়ে গেছে, কচমচ, রক্ত, গোলাপ, অসংখ্য ফুলে বাড়ীটাকে এত দুঃখের মাঝেও একটু সান্ত¡না দিচ্ছে। এ ফুলগুলো মমের মার খুব প্রিয় ছিল। ভদ্র মহিলা এই ফুল গাছগুলো বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিল। সে সুন্দর করে নিজের সংসার গোছানোর আশায় এ সব করেছিল।
ডাক্তার সাহেব বড় ভেঙ্গে পড়েছেন। সাত দিন অতিবাহিত হয়ে গেল তার স্ত্রী মারা গিয়াছে। তার মনে হল তার কোন অস্তিত্ব নেই। তার কোন প্রাণ নেই, কোন স্বস্তি নেই। সম্মান, যশ, অর্থ-সম্পদ যেন এ সংসারে ছেলে খেলার মত, এই আছে আবার চিরতরে বিলীন। আসা-যাওয়ার মাঝে সাময়িক আনন্দ বৈ আর কি? এ সকল বিষয় তার মনে বারবার দোলা দিচ্ছে। আর স্ত্রীর করণীয় বিষয় গুলোর স্মৃতি চারণ করেন। বেলা দশটার সময় মা মুশুকে বোতলে করে দুধ খাইয়ে দিতেন। জামা কাপড়গুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখতেন। ডাক্তার সাহেব বাসায় থাকলে তাকে খুব কড়া করে চা করে দিতেন। আর মমের মা জানতেন মমের বাবা কি কি খেতে ভাল বাসতেন। খাশির গোস্ত লাউ দিয়ে রান্না করে দিলে খুব খুশি হতো। বেশী করে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ দিয়ে ছোট মাছ চরচরি করে দিলে ডাক্তার সাহেবের মেজাজ সেদিন নরম হয়ে যেত।
(চলবে——–)।
