
[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : সেই ছোট বেলায় নন্দার মা মরে গিয়েছিল এক দিনের জ্বরে। ডাক্তার কবিরাজ দিয়ে দেখাবার সময়ও না কি পুরোহিত পায় নি। আজও সে কথা নন্দার কাছে বলে দুঃখ করে। নন্দার মা-ও নাকি অপূর্ব সুন্দরী ছিল। নন্দা কোনদিন উচ্ছল ছিল না। সে ছিল ধীরস্থির, শান্ত, ভীরু একটি কোমল মেয়ে। ঠাকুর ঘরের প্রতিমার সঙ্গে তার রূপের তুলনা করা চলে- পটল তোলা দুটি ভীরু চোখ, ভাদ্রের নদীর মত তার যৌবন, যেন দু'কুল ছাপিয়ে ভেসে চলেছে কোন অজানা সাগর পারে। আস্তে আস্তে সে কথা বলে। আস্তে সে চলে, রক্ত ঝরা ঠোঁট দু'টি রক্ত গোলাপের মত লাল, যেন সব সময় তাজা রক্ত ঝরে পড়ছে। এত সুন্দর, এত মোহনীয় সে। সারা গ্রামের লোক তাকে একটু দেখার জন্য তার মুখের মিষ্টি কথা শোনার জন্য ব্যাকুল- কিন্তু নন্দা কারো জন্য এতটুকু ব্যাকুল নয়। সে ব্যাকুল পুজা ঘরের পুজার জন্য। বাপের খাওয়া দাওয়া আর তার বিশ্রামের জন্য। সেদিন ছিল চৈত্রের বাসন্তী পূর্ণিমা। সারা মাঠ ঘাট জ্যোৎস্নার আলোয় মুখর। শুকনো মৌসুমে শুকনো পাতা একটি একটি করে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে। কিংশুক সলাজ হয়ে তাঁদের বুকে মুখ লুকাচ্ছে। রজনীগন্ধা তার সুবাস ছড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়েছে। বকুলের মাতাল করা গন্ধে, যেন প্রাণ বিভোর হয়ে উঠছে। নন্দা চেয়েছিল দূরে, আরো দূরে, আকাশের বড় চাঁদটার দিকে।
কত বড় চাঁদ! কত সুন্দর! জীবনেও বোধ হয় এত সুন্দর চাঁদকে দেখেনি। কোথা থেকে যেন বাঁশীর সুর ভেসে এল, সে সুর, আরো সুন্দর, চাঁদের থেকে মধুর। কে কে বাজায় এ মোহন বাঁশি। নন্দা ব্যাকুল হয়ে উঠল। মনের অগোচরে সে চলে গেল ঘর ছেড়ে অনেক দূরে। চেনা নাই, জানা নাই, কেহই নাই। শুধু একমাত্র বাঁশির সুরই তার সম্বল। হাঁটতে হাঁটতে দু'টি পা তার ক্লান্ত হয়ে এল, দেখল দূরে অনেক দূরে সমস্ত বন আলো করে দেবতার মত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। নন্দা সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কুঞ্জও পাতার খসখস শব্দে বাঁশি ছেড়ে দিয়ে নন্দার চোখ পানে তাকিয়ে থাকল। কত না যুগের কত না বলা কথা তার চোখে চোখ রেখে বলে গেল। সে বলার শেষ নেই, সীমা নেই, অনন্ত অসীম সে চাওয়া। অনন্ত অসীম সে পাওয়া অনেকক্ষণ পর কুঞ্জ বলল, কে তুমি? নন্দা লজ্জা পেয়ে ছুটে পালাতে চাইল। কুঞ্জের কাছে গিয়ে হাত ধরতে চাইল। নন্দা আরো দূরে সরে গেল। যে পথ দিয়ে সে এসেছিল সে পথেই আবার ফিরে গেল।
রাত্রি কেটে যায়- সুখ স্বপ্নের ভিতর দিয়ে নতুন আবেশে ভরে যায় মন, কি যেন নতুন পাওয়ার আশায় নন্দার মন কল্পনায় ভরে ওঠে। ভোর হয় পূর্বের ন্যায় আজও সে বাপের পুঁজার ফুল তুলে পুঁজার ঘরে দিয়ে যায়। বাপের আহ্নিকের যোগাড় করে। রান্না করে দুপুর বেলা কাছে বসে খাওয়ায়,, এটা খাও, ওটা খাও বলে শত আব্দার করে খাওয়ায়। আজ যেন সে কাজে বেশী আনন্দ পায়। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে গিয়ে বিকাল হয়ে আসে। নন্দা দ্বিগুণ করে নিজকে সাজাতে লাগল। রাশিকৃত লম্বা চুল পরিপাটি করে বেঁধে ফেলে একটি এলো খোপা। খোঁপায় গুঁজে দিল লাল, নীল, বিভিন্ন রকমের মটর কাটা। চোখে পড়ল কাজল, কপালে দিল একটি খয়েরের ছোট টিপ। সুন্দর চওড়া গরদের লাল শাড়ীটা সুন্দর করে গুছিয়ে পড়ল। যেন শত জনমের বুভিক্ষিত কোন প্রিয়তমের আশায় সে ঘন্টার পর ঘন্টা। সেদিনও সোনার থালার মত করে প্রতিপদের চাঁদটা বকুল গাছের উপর দিয়ে ভেসে উঠল। চাঁদের আলোয় যেন সারা গ্রামটা হেসে উঠল। হেসে উঠল নন্দার সমস্ত মন, শিহরে উঠল রক্ত চঞ্চল শিরাগুলি, শিরায় শিরায় কার যেন মৃদু শিহরণ অনুভব করল।
অনেক রাত্রে পুরোহিত বাড়ি ফিরে এলো। নন্দা তাকে খাইয়ে দাইয়ে নিজেও খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল। দূরদূরান্ত থেকে ভেসে আসছে সেই মোহন বাঁশির সুর। সে কি করুণ আবেদন- "কালা তোর তরে কদম তলায় বসে থাকি, চেয়ে চেয়ে গেল মোর কাজল পরা দু'টি আখি"। অনেকক্ষণ ধরে বাঁশি বেজে বেজে হয়রান হয়ে গেল। নন্দা আর ঘুমাতে পারে না। আস্তে আস্তে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল বাঁশির সুর লক্ষ্য করে। আজ কুঞ্জ কেন যেন তৈরি হয়েছিল। জানত সে নন্দা আসবে। নন্দা আসল অনন্ত রূপরাশি ছড়িয়ে। কুচবরণ কন্যার মেঘবরণ চুল ছড়িয়ে, মৃদু পায়ে এসে দাঁড়াল কুঞ্জের একেবারে চোখের সামনে। দু'জন দু'জনের পানে চেয়ে থাকল-অনিমেষ নয়নে, যেন কত জনমের ভীরু দু'জোড়া চোখের ব্যাকুল মিনতি। দু'টি ব্যাকুল হৃদয়ের আত্ম-নিবেদন। দু'জোড়া চোখের চাওয়ার মাঝে দু'জনের হৃদয় দু'জনের হৃদয়ের কাছে নেমে এল।
(চলবে----------)।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ