
[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : মি. খান ও মিসেস খান মেয়েকে নিয়ে ফিরে এলেন। এবার আর সি.এম.এস.এ নয়, ধানমন্ডির নিজের ১৮ নং বাসায় যেখানে কুসুম শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত লালিত পালিত হয়েছে। যেখানে হাসিখেলা, গল্প ও রূপকথার আসর বসত। যেখানে মা-বাবার আনন্দের প্রেম কানন দেখেছিল। নিজের জীবন দিয়েও চেয়েছিল এমন একটি প্রেম সুরভিত মঞ্চ তৈরী করতে। কিন্তু কুসুম পারে নি, কুসুম ব্যর্থ হয়ে বিফল মনোরথ হয়ে আবার জীবনের শেষ পর্যন্ত বাবার আশ্রয়ে জীবনের শেষ আয়ু নিয়ে এসে দাঁড়াল। মা ব্যস্ত হয়ে পড়ল কুসুমের খাওয়া, শোয়া, বিশ্রাম নিয়ে। কুসুম সেদিন বাথরুমে যেয়ে নিজেই স্নান করে এলো। যেমনি আগে দামী সাবান নিয়ে গোসলখানায় অনেকক্ষণ সুন্দর করে ঘষে ঘষে গোসল করত। গোসল সেরে ঘরে এলো। মা বললেন, এবার কিছু খাও মা।
কুসুম বলল, মা তোমরা শুধু খাও খাও বলো, আর আমার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি আমাকে সি.এম.এস.এ নিয়ে অক্সিজেন দাও। বাবা বাড়ীতে ছিলেন। তিনি নিজে গাড়ী ড্রাইভ করে কুসুমকে নিয়ে শেষবারের মত সি.এম.এস.এ এলেন। ডাক্তাররা অক্সিজেন দিল। কুসুম চোখ বুজে থাকল। বাবা তার পালস ধরে থাকলেন। মা অনিমেষ নয়নে কুসুমের কুসুমিত মুখের পানে চেয়ে থাকলেন। এমনিভাবে কুসুম সারাদিন অচেতন অবস্থায় থেকে রাত নয়টায় শুকতারার মত আস্তে আস্তে বিশ্বের বুক থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেল।
মা কেঁদে বুকে লুটিয়ে পড়ল, কুসুম একবার আমার কোলে আয়। বাবা কেঁদেছে কিন্তু চোখে কোন জল গড়িয়ে পড়ে নি, পাষাণের মত হৃদয় শক্ত করে তাকে সবকিছু মোকাবেলা করতে হয়েছে। কুসুমের ডেড বডি বাসায় নিয়ে এলেন। মিসেস খানকে এক রকম জ্ঞানহীন অবস্থায় তুলে আনল। লোক ঠেকানো যায় না। তার বিপদে সকলে আপন আত্মীয়ের মত কাঁদতে লাগল। কুসুম এ পাড়ার সকলের আদরের সামগ্রী ছিল। গোসল দিয়ে কাফন পড়িয়েছে কুসুম, যেন তার বাবার সাজানো ড্রইং টেবিল। তেমনি ফুলের মত ধুপধোঁয়ায়, আগরবাতিতে মৌলভী মাওলানা গণের কুর'আন তিলাওয়াতের সুমধুর স্বরে সারা রাত সকলে সঞ্জীবিত করে রাখল। যোহরের নামাযের সময় হয়ে গেল। কুসুমকে এবার সমাধিস্থ করা হবে। সব আপন লোকজন এসে গেল। কুসুমের মা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। সকলে শেষ বারের মত তাকে দেখার আমন্ত্রণ জানালে মিসেস খান দৌড়ে এসে লাশবাহী খাট আঁকড়ে ধরলেন, বললেন, আমার মেয়েকে তোরা নিস না। এভাবে কান্নায় জড়িয়ে পড়লেন। তার আর্তনাদে লাশ বহনকারীরা চমকে উঠল।
কবির ভাষায় যেতে নাহি দিব হায়, তবুও যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। সকলের উপস্থিতিতে অতি যতœ সহকারে সাদরে সম্ভ্রমে মর্যাদা সহকারে তাকে সমাধিস্থ করা হলো। কুসুমের সেই নরাধম স্বামী জানাযায় উপস্থিত ছিল। কুসুম পার্থিব সকল জ্বালা যন্ত্রণার ইতি টেনে চলে গেল পরপারে। কিন্তু রেখে গেল বিগলিত ভারাক্রান্ত তার মায়ের হৃদয় শুন্য করে গেল দুটো সন্তানের মায়ের ভালবাসা।
মিসেস খান ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে শতচ্ছিন্ন, শত জর্জরিত মন নিয়ে নাতনি ও নাতিটিকে কাছে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু পাষ- জামাই তাদের রাখা তো দূরের কথা, নানা-নানীর কাছে আসতে দিতে চায় না। কুসুম রোজার প্রথম সপ্তাহে মৃত্যুর শীতল কোলে আশ্রয় নিল। রোযার পর ঈদ উপলক্ষ্যে একদিন ভাঙ্গা মন নিয়ে নাতিদের দেখার জন্য জামাই বাড়ী গেল। বেয়াইন সাহেবের কাছ থেকে দীনহীনের মত চেয়ে নাতি-নাতনিদের ঈদের জামা দিবে বলে গাড়ীতে তুলে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কোথা থেকে যেন জামাই এসে বাচ্চা দু'টোকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল। মিসেস খানের চোখ দু'টি অসীম স্নেহে, অপরিসীম অপমানে আগুনের ফুলকার মত জ্বলছিল। ছেলেমেয়ে দু'টি বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। মেয়ের ফুলের মত মুখখানা সব সময় হৃদয়ের কন্দরে ভেসে ওঠে। যদি মেয়ের এই কচি বাচ্চা দু'টো কাছে পায়, তবুও শোকাহত হৃদয় একটু প্রশান্তি পায়, তাও নরপিশাচটা দেবে না।
ইতিমধ্যে বাচ্চা দু'টো মিসেস খানের বাড়ী এনেছে। ঐ শিশুদের বাবা ওদের জন্য উকিল নোটিশ দিয়েছে। বাচ্চা দু'টোকে নানা-নাতির আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত করে রাখে। বাচ্চারা দুষ্টুমি করলে যদি কেউ বলে, দুষ্টুমি করো না। তোমার আব্বু বকবে। বাচ্চারা বলে, আম্মুর মত গোসলখানায় দরজা আটকিয়ে মারবে ? মিসেস খান ডুকরে কেঁদে উঠে- তাহলে ঐ জামাই আমার মেয়েকে কত অত্যাচার, অনাচার, মারধর গালমন্দ করেছে, কত নির্যাতন করেছে। আমার মেয়ে ধুকে ধুকে নির্যাতনে না টিকতে পেরে মৃত্যুকে স্বাদরে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে এত নারী নির্যাতন, নারী হত্যা, নারী ধর্ষণ, নারীর প্রতি অবিচার ও নিষ্ঠুরতার লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে তা শুধু গ্রামের নিরক্ষর, অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত লোকেরাই নয়, বরং সমাজের সুশৃংখল, উচ্চশিক্ষিত ভদ্রবেশী লোকজনই সবচেয়ে বেশী। যার বাস্তব প্রমাণ কুসুমের নরাধম স্বামী।
একদিন যখন মৃত্যু আসবে, যখন তুমি থাকবে না, আমি থাকব না, কেউ থাকবে না, অন্য মানুষ আসবে, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হয়ে যাবে। সেই একরাত্রে যখন ঘন ঘন তোপধ্বনির মধ্যে এই শতাব্দির অবসান হইয়া একবিংশ শতাব্দির আগমন ঘটবে তা যেন স্বচক্ষে দেখতে পাই। হে অনাগত যুগ তোমার জয় হোক।
(চলবে-------)
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ