
[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : আমি মেয়েদের কমান্ড করে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দিলাম এবং হ্যান্ডসেকের জন্য হাত বাড়ালাম। তিনি হ্যান্ডসেকের পরিবর্তে আমাদের সালাম জানালেন। আমি মুগ্ধ হলাম। সেদিন কোন সেলুটিং ব্যাজ ছিল না। ফুলের টব ছিল না, ন্যাশনাল ফ্লাগ ছিল না, কোন ব্যান্ড বিউগলের সুর বাজছিল না। শুধু বঙ্গবন্ধু আর আমি। এই প্রথম বুঝি আমি এক খাঁটি বাঙ্গালীকে স্যালুট করেছিল। এ দিনটি আমার জীবনের স্মৃতিপটে আঁকা থাকবে। এই গার্ড অব অনারের দৃশ্যগুলো টিভিতে দেখানো হয়েছিল।
তারপর ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর। ঘরবাড়ী থেকে নিরীহ লোকদের ধরে নিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে আরম্ভ করে পরে তাদের হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। পাক বাহিনীর এই হত্যা, অকথ্য নির্যাতন, লুটপাট আর অগ্নি সংযোগের ঘটনায় সারা বিশ্বের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। সারা দেশ যেন একটা নিথর কবরস্থানে পরিণত হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী ভারতে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়।
পাকিস্তানী বাহিনীর ২৫শে মার্চের এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুকেও গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়। এমন কিছু একটা ঘটতে পারে ভেবে বঙ্গবন্ধু নেতা কর্মীদেরকে স্বাধীনতা ঘোষণার ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। যার কারণে ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা দেশ জুড়ে শোনা যায়। ফলে হতবিহ্বল বাঙ্গালী জাতি নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে। তাই দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে সারা বাংলাদেশে। বাঙ্গালীর মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমি ভোলায় চলে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার স্বামী-সন্তানদের মুখ থমথমে। আমার বাবা এসে বললেন, ঢাকায় যা করেছিস, ভাল করেছিস। এখন আল্লাহ আল্লাহ কর। কিন্তু আমি কারো কথা শুনলাম না। না বাবার আদেশ, না স্বামীর উপদেশ। এখানে এক উকিলের বাসায় সব মেয়েদের একত্র করে রাইফেল ট্রেনিং এবং যুদ্ধ প্রতিহত করার কৌশল শিখাতে লাগলাম। কারণ তখন আমার কানে ছিল শুধু বঙ্গবন্ধুর কথা, আর সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আমার জীবনের কথা আর আমার এগার সন্তানের কথাও চিন্তা করলাম না শুধু দেশের জন্য।
এদিকে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক ও বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বর্বর পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন এবং নিজেদের হাতে অকুতোভয়ে অস্ত্র তুলে নেন। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে কেউ আবার দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করে ট্রেনিং গ্রহণ করে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সারাদেশে এক যোগে মুক্তিবাহিনী পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। ডিসেম্বরে পাক বাহিনী ভারত ও আক্রমণ করলে পরে ভারতীয়রা মুক্তিবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে চলে।
এরই মধ্যে পরাজয় অবধারিত দেখে পাকবাহিনী শেষবারের মত এ দেশকে দুর্বল করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়। ১৪ ডিসেম্বর তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যায়। তাদের এই কাজে দেশীয় কিছু লোক সাহায্য সহযোগিতা করে। অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, শহিদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বি, জহির রায়হান সহ আরো অনেক বীর সন্তানরা প্রাণ হারায়। যাদের চরণধূলোয় ধন্য ছিল এ দেশ, তাদের পাক বাহিনী হত্যা করে এ দেশকে পঙ্গু বানিয়ে দেয়।
এদের মাঝে আমার ডা. ফজলে রাব্বীর কথা বিশেষভাবে মনে পড়েছে। কারণ তাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে জানতাম, বিভিন্ন রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখাতাম। একবার তাঁর চেম্বারে গেলাম, আমার সিরিয়াল ছিল অনেক পরে। আমি অপেক্ষা করছিলাম। এরই মাঝে এক লোক ডা. রাব্বীর কাছে আসল। এক পায়ে স্যান্ডেল ছিল অন্য পায়ে ফিতা ছেড়া দড়ি দিয়ে বাঁধা স্যান্ডেল। পরনে শুধু একটা ধৃতি। খালী গা। ডা. রাব্বি জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কখন এসেছেন? লোকটি বলল, প্রথমেই এসেছি। তখন ডা. রাব্বি বলেন, তাহলে আপনি এখন এসেছেন কেন? লোকটি বললেন, আপনার কম্পাউন্ডার আমাকে এখন দিয়েছে। তখন তিনি কম্পাউন্ডারকে জিজ্ঞাসা করলে কোন উত্তর দিতে পারেনি। তখন ডা. রাব্বী কম্পউন্ডারকে বললেন, গরীব বলে লোকটাকে পরে দিয়েছ, যাও তোমার চাকরী শেষ। একটা টিবির রোগীকে এ ধরণের আচরণের কম্পাউন্ডারের এই শাস্তি! তার এই মানবতাবোধ দেখে আমি সহ অন্যান্যরাও মুগ্ধ হলাম। (চলবে------)
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ