
ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : শুধু হাত বাড়ালেই আমি পাই। মাঝে মধ্যে আমি রাগের ভান করে দেখতাম ডোরা কি করে। একদিন দুপুর রাতে রাত ১২টায় ফোন বেজে উঠত, ডোরার অভিযোগ প্রশান্ত ফোন করনা কেন ? আমি বললতাম- তুমি বুঝি খু-উ-ব ফোন কর ? হেসে উঠত, দু’জনেই ভার্সিটিতে মাস্টারী করি, সারাদিন ছেলে-মেয়েদের ঠ্যাঙ্গানী করে বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে বসতাম। কিন্তু মনের গভীরে দু’জনে দু’জনের অনেক কাছে ছিলাম। মনের গভীর হৃদয় তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সব সময় ডোরার মুখ আমার বুকে বাসা বেঁধে ছিল। ডোরা হারিয়ে যাবে, আমার জীবন থেকে মুছে যাবে, এ ছিল আমার কল্পনার অতীত।
হঠাৎ দেখলাম ইরা এসে চিৎকার করে কেঁদে উঠল দিদি নেই---দিদি নেই। আমি দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম ডোরাকে একটি সাদা চাদর গিয়ে ঢেকে রেখেছে। আমি চিৎকার করে কেঁদে লুটিয়ে পরলাম ডোরার গায়ের উপর। ডোরা ডোরা একবার বল প্রশান্ত, একবার একটু কথা বল, তুমি রাগ করে চলে যেওনা। অনেক কাঁদলাম, ডোরার ভার্জিনিয়ার, ভার্সিটির প্রফেসররা অনেকে তখন এসে পরেছিল, ডেড বডি কি করা হবে। আমি বললাম, ডেড বডি মন্ট্রিলে নিয়ে যাব। ইরা বলল, ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাবে। ডোরার কলিগরা বলল, ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাবার জন্য। আমাকে সকলে রোগীদের ড্রইং রুমে বোঝান হল, কান্না-কাটি করে কি হবে ? মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না, তবু ভগবান আপনাকে সময় দিয়েছে। ওর সাথে একত্রে এতদিন মেলা মেশা করার। ওকে আপনি আশির্বাদ করেন। ভার্সিটি প্রফেসাররা বলল, আপনাকে একটি বইয়ের নায়ক করে গেছেন, পেয়েছেন বইটি ? আমি বললাম- না, তবে শুনেছি ওর মুখে। ইরা খুব কাঁদছিল।
দিদি, দিদি, তুমি আমার সাথে রাগ করে চলে গেলে ? মাসিমা তোমাতে ইন্ডিয়ায় যেতে বলেছে। তুমি সেই চলে এলে ইন্ডিয়া থেকে আর একবারও ইন্ডিয়ায় গেলে না। তুমি ভুলে গেছো সকলকে। কিন্তু আমরা তোমাকে মনে রেখেছি। মাসিমা বলে দিয়েছে ডোরা ভাল হবে, ওকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে চলে আসিস। দিদি চল, চল দিদি; আমরা ইন্ডিয়ায় যাই। এখানে থেকে কি হবে বৃথা বিদেশের মোহ। প্রফেসাররা ডোরার ডেড বডি কফিনে করে ইরার সাথে ইন্ডিয়ার কোলকাতা পাঠাবার বন্দোবস্ত করার আয়োজন এর সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করল। আমাকে ডোরার বাসায় নিয়ে এল। ইরাও এল। দেখলাম, বুক শেলফে সুন্দর একটা ভেলভেটের লাল বাক্সে আকাশের কত রং বইগুলি সাজান। সাবধানে সযতেœ আমার লেখা চিঠি আছে। শ্রদ্ধার সাথে সকাল-সন্ধ্যায় সেখানে বোধ হয় ফুলের অর্থ ধুপধুনা দিত। এতদিনের অযতেœ সেখানে ময়লাও ধুলা জমে ফুলগুলি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। বুক শেলফের উপর একটি ফটো রাখার এলবামে আমার একখানা ফটো আছে, নীচে লেখা আছে---
শুধু তব এক বিন্দু নয়নের জল,
কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জল,
এই তাজমহল।
আমি আর থাকতে পারলাম না। ডোরা ডোরা বলে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম। মারিয়া এখন আমাকে ইরাকে দেখাশুনা করছে। বুঝ বুঝ দিয়ে রাখছে, ডোরার কোথায় কি আছে ইরাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিচেনে রান্না করছে, আমাদের খাওয়ার জন্য সাধ্যি সাধনা করছে। কিন্তু আমরা কেউ কিছু মুখে দিচ্ছি না। মেয়েটি ইরাকে খুব আদর দেখাচ্ছে। বলছে, তোমার দিদি খুব ভাল প্রফেসার ছিলেন। খুব লার্নেড ছিলেন, এখানকার ভার্সিটির প্রফেসাররা তোমার দিদিকে খুব রেসপেক্ট করতেন। আমি একয়দিন বাড়ী-ঘর, বাবা-মা সব ছেড়ে তোমার দিদির পাশেই ছিলাম। সন্ধ্যে হলে আসছে। শুকতারা আকাশের এক কোনে মিটি মিটি জ্বলছে। আমি সাথীহারা বিভ্রান্ত পথিক, অনাদি অনন্ত প্রশ্ন নিয়ে তার পানে চেয়ে আছি। ভাব নেই, ভাষা নেই, কথা নেই, চাওয়া নেই, পাওয়া নেই।
ইরা বিছানায় লুটিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে, দিদির সব আছে; দিদি নেই। আমি ইরাকে কি বোঝাব, আমি নিজেকেই বোঝাতে পারছি না। আমি নিজেই বেহুস। ইরাকে আমি কি বোঝাব ? এত ভালবাসলাম, এত ভালবাসা-প্রেম রোমাঞ্চ। গভীর গভীরতœ, মান-অভিমান। দুদিন আগেও বিরাট ফিলজফির বুলি আওরিয়ে এমনি করে রোগের ভান করে ডোরা চলে গেল। কেন চলে গেল ? দু’জনে যদি এক সাথে যেতাম; তাহলে আজ কেউ কারো জন্য দুঃখ করতাম না। মধ্যরাত, রাত গভীর থেকে গভীর হতে লাগল। হসপিটালের স্মৃতি আমার মানমন্দিরে মনের দেউলে ভেসে উঠল জন্ম-মৃত্যুর তান্ডব লীলা। সারা রাত্রি নার্স-ডাক্তারের আনাগোনা, রোগীদের যাওয়া-আসা। কেউ এসে ভর্তি হচ্ছে, কেউ মৃত্যুর শেষ পরপারে পাড়ি দিচ্ছে।
সমাপ্ত।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ