ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদী বেষ্টিত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তার দায়িত্বে কাজ করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোন। এরা দক্ষিণাঞ্চলের যে কোন জেলা অভিযান পরিচালনার সময় সেখানকার উপস্থিত লোকদের মাঝে থেকে যে কাউকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যাদেরকে তারা সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেন, তারাই পরবর্তীতে নদী, জেলে এবং নদী তীরবর্তী এলাকায় কোস্টগার্ডের নাম ব্যবহার করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। হাতিয়ে নেন হাওয়াই (ধান্দাবাজি)’র মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা। এমনই তথ্য মেলে অনুসন্ধানে। আজ জানুন এমনই একজনের কর্মকান্ড।
সূত্রে জানা যায়, ভোলার ইলিশার মেঘনার জলদস্যু কুখ্যাত ডাকাত দলের টপ অব টাউট কার্তিক এখন কথিত কোস্টগার্ড সোর্স দাবীদার। কার্তিক এক সময়কার মেঘনার দুর্ধষ ডাকাত থেকে সোর্স আর সোর্স থেকেই রাতারাতি হয়ে যায় কোটিপতি। অতঃপর আতঙ্কিত জেলে সাধারনদের দেয়া উপাধিতে তিনি এখন বাবু কার্তিক নামেই পরিচিত মেঘনার তীরবর্তী জেলে, মাঝি, ঘাট মালিক, মাছ ব্যাবসায়িদের নিকট। এক সময় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটানো কার্তিক মিষ্টির দোকানের বেয়ারা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। বেয়ারা থেকে জলদস্যু দলে কার্তিক যোগদানের পরে দল নায়ক মান্নান মাঝির মৃত্যুর হয়। মান্নানের মৃত্যুর পরে ঐ জলদস্যুদলের সেনাপতি হন কার্তিক। মজু চৌধুরি হাটের আলমগীর, মতির হাটের খালেক মাঝি, কালিগঞ্জের আলতাফ সর্দার, আলেকজান্ডারের আলতু কার্তিকের ডাকাতির সহযোগী ছিলেন বলে জানা যায়।
কার্তিক জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালে আমি ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার হই। গ্রেপ্তারের পরে ঈড মুলে আমাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হলে দীর্ঘ ৮ মাস কারাবাস করি। কারামুক্তির পরে কার্তিকের পরিবারের অবস্থা এমনই হয় যেন নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমনটি জানান কার্তিক বাবু। কার্তিক কারাগার থেকে মুক্তির পরে আলোর পথে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিততে তৎকালীন একজন স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ এর স্মরনাপন্ন হলে তিনি কার্তিককে নগদ ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা করেন। তবে ডাকাতি মামলাতে তিনি ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়েছেন বলেও জানান কার্তিক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐ সহায়তার টাকায় কার্তিক খুলনা থেকে কয়েকটি সনাতন ধর্মালম্বি জেলেকে দাদন দিয়ে আনেন মেঘনায় পাই জাল ও বেহুন্দী জাল বাওয়ার জন্য। ঐ জেলেদের মাছ বিক্রির পার্সেন্টিজ নিতেন কার্তিক। জেলেদের সাথে সম্পৃক্ততার যে কোন ভাবে কার্তিকের সখ্যতা গড়ে উঠে প্রশাসনের একটি বিভাগের সাথে। তবে কার্তিক বলেন ঐ প্রশাসনের প্রারম্ভিক কাল থেকেই তিনি জড়িত তাদের সাথে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, দস্যুতা থেকে নিজেকে আড়াল করতে কিছুদিন পার হলেই কার্তিক যোগদান করেন কোস্টগার্ড সোর্স হিসেবে। পাল্টে যেতে শুরু হয় কার্তিকের অভাবের তারনায় অনাহারে থাকার দিন। এভাবেই আসতে শুরু করে কার্তিকের সুদিন, এমনটাই জানালেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার সর্তে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত একাধিক ব্যক্তি, জেলে মাঝি, ঘাট মালিক, খুটা জালের মহাজন, পাই জালের মহাজন, বেহুন্দি জালের মহাজন, কারেন্ট জাল বিক্রেতাদের কাছ থেকে উঠে আসে কার্তিকের নিরবে চাঁদা কালেকশনের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এদিকে হাওয়াই কালেকশনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কার্তিক বিক্রি করেন প্রশাসনের কিছু বিভাগকে এমন বেশ তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।
কার্তিক বাবুর গোপন কালেকশনের অন্যতম সহায়ক হিসেবে কামাল হোসেনের নাম পাওয়া গেলেও কামালের সহকারি অন্য আরেকজনের সন্ধান পাওয়া যায়। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের সোর্স হিসেবে পরিচিত কামাল হোসেনকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন ভোলা কোষ্ট গার্ডের একটি বিশেষ টিম।
কামাল হোসেন প্রশাসনের নাম বিক্রি করে অসৎ উপায় অবলম্বের দ্বায়ে জেল হাজতে থাকলেও বাকিরা রয়েছে অধরা। শুধু তাই নয়, এখানকার একাধিক অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের নাম বিক্রি করে অর্থ আদায়ের দায়ে একাধিকবার কারাবাস করার পরে আবার ফিরে আসেন একই পেশায় এমন তথ্যে রয়েছে। অনুসন্ধানে মনির নামক এক ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে কার্তিক তার পরিচয় নিশ্চিত করেন তিনি।
তবে বাবু কার্তিক কে ? এ বিষয়ে তার ব্যাবহৃত ফোনে কল দিয়ে তাকে সাংবাদিক পরিচয় দিলে সে বলেন, আপনে আবার কেঠা ? পরে কথা বলবেন বলে লাইটি কেটে দেন কার্তিক। ঘন্টা খানেক পার হলেই আবার কলব্যাক করেন কার্তিক নিজেই। দেখা করতে বলেন তার সাথে তার চেম্বারে। দেখা করার টাইম ও স্থান বলে দেন কার্তিক। যথাসময়ে হাজির অনুসন্ধানী টিম কার্তিক বাবুর চাঁদা কালেকশনের চেম্বারে।
এছাড়াও ইলিশার ফেরিঘাট এলাকায় খোঁজ মেলে কার্তিকের কালেকশন অপর একটি চেম্বারের। যেখানে কার্তিক ব্যাবহার করছেন কোস্টগার্ডের পরিচয়। ঐ চেম্বারে ফ্রিজ সহ সকল ব্যবস্থাপনাই রেখেছেন কার্তিক বাবু। এ চেম্বারে ঢুকতেই জাগে নতুন প্রশ্ন ?
বাংলাদেশের স্বনামধন্য মেঘনার জলদস্যুসহ সকল চোরাকারবারি নির্মুলে দিনরাত কাজ করে যাওয়া কোস্টগার্ডের শুনাম বিনস্ট করার সাহস কার্তিক কোথায় পেল ? এমন প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। জানতে চাইলে কার্তিক বলেন, আমি কোস্টগার্ডের ১৫ টি কন্টিনজেন্টে কাজ করি। দক্ষিণ বাংলার ২১টি জেলা আমার নিয়ন্ত্রণে। কোষ্টগার্ডের কোন পদের স্টাফ আপনি এবং আপনার কাজের ধরনটা কি ? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি কোস্টগার্ডের সোর্স, আমার কাজ হচ্ছে জলদস্যু, ডাকাত, পাচারকারী, মাদক কারবারি, কারেন্ট জালসহ অবৈধ কাজের তথ্য দেয়া।
ইলিশার কার্তিক বাবুর বিষয়ে প্রশাসনের নৌ পুলিশের ওসি এবং জেলা মৎস কর্মকর্তা জানান, কার্তিক নামে আমাদের নিয়মিত নিযুক্ত কোন মাঝি নেই। আমাদের নাম বিক্রিকরে কোন অর্থ উপার্জন করেছে এমন সুনির্দিষ্ট প্রমান কারো বিরুদ্ধে পেলে আমরা আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করবো।
কার্তিক বাবুল ব্যাপারে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের মিডিয়া অফিসার সাব্বির এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই নামে আমাদের কোন সোর্স নেই। আমাদের নির্ধারিত কোন সোর্স থাকে না। যে কোন ব্যক্তি, যে কোন সময় সোর্সের কাজ করতে পারে। তবে কোস্টগার্ডের নাম ব্যবহার করে কেউ কোন চাঁদাবাজী করলে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
সুপ্রিয় পাঠক এখানেই শেষ নয় কার্তিকের হাওয়াই বানিজ্য। আমাদের সাথেই থাকুন আর চোখ রাখুন ভোলার বাণীতে। মেঘনায় হাওয়াই বাণিজ্যের অপরাধিদের চিত্র আমরা প্রকাশ করবো আগামী পর্বে। সেখানে থাকবে কার্তিক এর অবৈধ কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য।
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ