
ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত সংখ্যার পর), ঐশ্বর্য (বাবা-মাকে স্মরণ করে)
আমি মরে গেলে, ওগো প্রিয়তম,
গাহিয়োনা শোক গীতি,
কবরে আমার বুনোনা গোলাপ,
রচিও না ঝাড় বীথি।
সেথা তৃণদল গাহিবে শ্যামল,
ভিজিয়া শিশির দলে,
যদি মনে হয়, স্মরিও প্রিয়
ভুলিও ইচ্ছে হলে।
চিরজয়ী সেই গোধুলির দেশে,
কুহেলি স্বপন বনে,
হয়ত: আমারে ভুলে যাবে সখা
হয়ত পড়িবে মনে।
কেন জানি এ কাবিতায় ক’টি লাইন আমার বার বার মনে পড়ে। মা অনেক দিন অনেক বছর দূরারোগ্য ব্যধিতে ভুগে ভুগে শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন। অথচ মার মত এত সুন্দরী আমার চোখে আর কেউ পড়েনি। দুটি ডাগর ডাগর কাজল কালো মন ভুলানো আখি। গৌরবর্গ কাচা হলুদের মত রং আমার চোখে কমই পড়েছে।
মাকে নিয়েই ছিল আবার অনাবিল আনন্দের সংসার। চার ভাই বোন আমরা, লোকে বলে একজনের চেয়ে একেক জন সুন্দর। বাঙ্গালী বলে নাকি ওরা আমাদের ভুল করে। অনেকে আমাদের পাকিস্তানী মেয়ে বলে ভুল করে।
মা’র হাসি ছিল অদ্ভুত সুন্দর, কাচের চুড়ির মত রিনি ঝিনি করে বেজে উঠত। মৃদ মন্দ রুনু ঝনু করে হাসত। নবাব সিরাজ উদ দৌলা নাকি আলেয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিল, এমন মিষ্টি হাসি তুমি কেমন করে হাস ? জানি না বাবা মা-কে কোনদিন প্রশ্ন করেছিল কি না। তার সুন্দর রিনি ঝিনি হাসি অদ্ভুত সুন্দর ছিল। রান্না জানত বেশ মজার। লোককে রেধে খাইয়ে খুশী করে রাখতে পারতো। এক খানা ভাল শাড়ী পড়লে মার চেহারা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা যেত না।
আব্বা যখন কোলকাতা সিটির ফাষ্র্ট সেক্রেটারী ছিলেন, মা অনেক সুখী ছিলেন। কিন্তু রোগ যন্ত্রণায় মাকে বেশীর ভাগ সময়ই হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। মা’র ইচ্ছা ছিল মার কাছে আমি থাকি। আমাকে সে জন্য প্রায়ই ঢাকা কোলকাতা করতে হয়েছে।
চমন তখন চিটাগাং বা কক্সবাজার রাঙ্গামাটি থেকেছে। আমি ঢাকা থাকতাম বলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র আসা যাওয়া করতে কোন কষ্ট হত না। শেষ পর্যন্ত মা কিছুকাল ভাল হয়ে হয়ে এলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ্য হতে পারলেন না। বাবার চাকরীর মোয়াদ ফুরিয়ে এলো বাবা মাকে নিয়ে খুলনায় চলে এলেন। খুলনায় এসে কিছু দিন মা বোধহয় ভাল ছিলেন।
মাঝে মধ্যে রোগ যন্ত্রনা বেড়ে গেলে ঢাকায় এসে কেমো থেরাপি দিয়ে চলে যেতেন। তখন পূজার ছুটি ছিল শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশ কুয়াশার চাদর বিছিয়ে বলাকার উড়েছিল। দেশ হতে দেশান্তরে। মার শরীর খারাপ থাকতে মাকে নিয়ে ডাক্তারের শরনাপন্ন হলাম। ডাক্তারের কাছে গিয়ে মা যেন কেমন এলিয়ে পড়েছিলেন। আমার কাছে কায় মিনতি করে একটু পানি খেতে চেয়েছিল। আমি দৌড়ে তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে এসে দেখি মা পৃথিবী ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে পাড়ি দিয়েছে। আমি মা, মা করে কেদে মায়ের গায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে মাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
(চলবে----------)
সম্পাদকঃ মো: হারুন অর রশীদ