ভোলায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি ও টেকসই পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত

শরীফ হোসাইন ॥ ভোলায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি ও টেকসই পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজন সমন্বিত স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করণ” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) দুপরে উপজেলা পরিষদের হলরুমে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের আয়োজনে সংস্থার ক্লাইমেট চেঞ্জ’র প্রধান এম.এ হাসানের সঞ্চালনায় ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিানারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আরিফুজ্জামান।
প্রধান অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আরিফুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, তীব্র নদী ভাঙ্গনের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার মাধ্যমে সব হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে। প্রকৃতির বাহিরে গিয়ে আমরা কিছুই করতে পারবোনা। অভিযোজন করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। উন্নত বিশ্ব পরিবেশ দূষণ করছে অথচ তারাই আবার আমাদের পরিবেশ সুরক্ষার উপদেশ দেয়। আমাদের ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় টেকসই বেড়িবাধ নির্মাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, স্থানীয় পর্যায়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃস্টি এবং তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলেই আর সেখানকার মানুষ বস্তুচ্যুত হবে না। এ জন্য আমাদের সরকারসহ সকলকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবেলায় সরকারের বিদ্যমান উদ্যোগসমূহ অপর্যাপ্ত, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি। উদ্যোগের বড় অংশই দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ ও অস্থায়ী পুনর্বাসনে সীমাবদ্ধ। পুনর্বাসণের জন্য আবাসন নির্মাণে গুরুত্ব দেয়া হলেও টেকসই জীবিকা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে। ফলে পুনর্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং মানুষ বারবার স্থানচ্যুত হয়। সংকট মোকাবেলায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুতিকে জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাজেটে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক, কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, কমিউনিটি-ভিত্তিক টেকসই পুনর্বাসন ও জীবিকা ভিত্তিক অভিযোজন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করাসহ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হ্রাসে টেকসই উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা অতবি জরুরী।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, সরকারি খাস জমিতে বাস্তুচ্যুতদের পূর্ণবাসান করার নীতিমালা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ খাসজমিগুলো বেশিরভাগই নদীর পাড়ে ও চরাঞ্চলে। মূল ভ-খন্ডের নিরাপদ জায়গায় যদি বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর জন্য বসবাসের স্থান নির্ধারণ করা যেত, তা হলে তারা বাস্তুচ্যুত হতো না। এছাড়া আমাদের নদীর ধারের স্লুইচ গেইটগুলো কাজ না করায় পানি নিষ্কাশন ব্যহত হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বেড়িবাধের উচ্চতা কমছে।
বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মোঃ আব্বাস বলেন, আমরা বিচ্ছিন্ন চর চটকিমারার বাসিন্দা। যেখানে সামান্য আবহওয়া খারাপ হলেই ভোলা সদরের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। নেই কোনো বেড়িবাঁধ, ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা আতংকে থাকি। আমাদের এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় আমাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সাথে সাথে নেই কোন স্বাস্থ্যসেবা, যার মাধ্যমে এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
আসমা বেগম নামে এক গৃহবধূ বলেন, ভেদুরিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর সাথে আমার ঘরটি। আগামী বর্ষায় থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে কোথায় যাবো আমি জানি না। তাই আমাদের তেঁতুলিয়া নদীতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবী জানাচ্ছি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় কোস্ট ফাউন্ডেশনের ক্লাইমেট চেঞ্জ’র প্রধান এম.এ হাসান বলেন, জলবায়ু বাস্তচ্যুতি মোকাবেলায় কেবল জরুরি সহায়তা বা বিচ্ছিন্ন পুনর্বাসন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী, সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা কাঠামো। যা বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ জীবন, টেকসই পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা নিশ্চিত করবে। বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে কাছাকাছি কাজ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের কারিগরি দক্ষতা, অর্থায়ন ও সমন্বয় ক্ষমতা সীমিত। স্থানীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে পারলে পুনর্বাসন কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই হবে।
এছাড়া সেমিনারে সিনিয়র সংবাদিক মোকাম্মেল হক মিলন, প্রথম আলো প্রতিনিধি নেয়ামত উল্যাহ, উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম, নদী ভাঙ্গন কবলিত ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া এলাকার বাসিন্দা এরশাদুল ইসলাম, চর চটকিমারার মনির, হারুন অর রশিদ শিমুল, ছিদ্দিকুল্যাহ, ধনিয়া এলাকার বাবুল, ভেদুরিয়া এলাকার মাকসুদুর রহমান, মোঃ স্বপন, রাজাপুর এলাকার আবুল কাশেম সরদারসহ নাগরিক সমাজ, এনজিও, সাংবাদিক ও বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মতামত ব্যক্ত করেন।
