ভোলায় দারিদ্র্য হ্রাস ও নারী ক্ষমতায়নে মাইক্রোক্রেডিটের প্রভাব নিয়ে এফজিডি সভা
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৫৩

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : হাসি : তোমার হাসি শোনার আগে আমি মনে করতাম, শুধু মনে করতাম কেন, মনে মনে ভাবতাম- নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাকি আলেয়াকে দেখে বলেছিল, এমন মিষ্টি হাসি তুমি কেমন করে হাস? ভেবেছিলাম উহা নবাবের একটা নিছক আবেগ, আবেশ বা সাহিত্যিকের নিছক কল্পনা। আজ তোমার হাসি শুনে আমি চমকে উঠলাম, কে, কে, এমন করে হাসে? আমার অতীত বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল। সেদিন যখন তোমাকে এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে গেলাম, প্রথম তোমাকে দেখে মনে হল অনন্ত যৌবনা উর্বশী তুমি। ভাদ্রের ভরা নদীর মত তোমার যৌবন। তেমনি ছলছল কলকল করে তোমার উচ্ছ্বাস ভরে নিয়ে চলছে। দু’টি ডাগর ডাগর আয়ত আঁখি যেন কত বুদ্ধিমত্তায় ছেয়ে আছে। তোমার বাগানে বর্ষার আগমনে কত ফুলের সমারোহ, তার চেয়ে আরো বেশী সমারোহ তোমার অঙ্গে অঙ্গে।
সেদিন মিলাদে তোমায় আনতে গিয়েছিলাম। কেন জানি গেটের দু’পাশে বনলতায় আমার শাড়ীটা আটকিয়ে গেল, কেন জানি গেটের দু’পাশে বেলি ফুলের কেয়ারী থেকে সুন্দর টাটকা তাজা ফুলের গন্ধ আমায় আনমনা করে তুলল। আমি জানি কেমন একটু ব্যাকুল হয়ে গেলাম। বসে থাকলাম তোমার ড্রইং রুমে, বিরাট প্রশস্ত ড্রইং রুম। তোমার কৃষ্টি ও কালচারের গৌরব বহন করে সাক্ষ্য দিচ্ছে, তুমি অনন্ত কালের অনন্ত সৌন্দর্য পিয়াসী। বিদেশীর একটা বড় ছবি দেখলাম। ছবিটা বড় ভাল লাগল। দেখে দেখে আমার যেন তৃপ্তি হল না। সেই সুদূর বিদেশে মনটা আমার গেল চলে। তুমি এলে একটি কুসুমকুঞ্জ, অপরূপ শোভায় ম-িত হয়ে। আনারের মত তোমার দু’খানি গাল, ডালিমের মত তোমার দু’খানি ঠোট। আবেগ আবেশ ভরা তোমার দু’টি আয়ত আঁখি। আমি যেন বিমুগ্ধ নেত্রে তোমার পানে চুরি চুরি করে দেখলাম। মিলাদে তুমি সকলের সাথে হাসলে কথা বললে, এদিক ওদিক তাকালে, হঠাৎ কি কোথায় শব্দ করে হেসে উঠলে। আমি যেন আমার পিছনে ফেলে আসা সুদীর্ঘ দশ বছরের অতীতে চলে গেলাম। সেই দশ বছর পূর্বে আমি খুলনায় সিরাজউদ্দৌলার ভূমিকায় এক মাস চেষ্টা করেছিলাম আলেয়ার মত মিষ্টি হাসি হাসবার জন্য।
সে আলেয়ার মত হাসতে পেরেছিল কিনা আমি বলতে পারব না। তবে হেসেছিল, চেষ্টা করেছিল- পেরেছিল কিনা জানি না। খোদা যাকে পাঠায় পৃথিবীতে সুন্দরের অধিকারী করে মানুষের কৃত্রিমতা তার কাছে হাস্যস্পদ। আজ তোমার হাসি শুনে আমার কি মনে হয় জান? এক গোছা বেলোয়ারী চুড়ি রিনিঝিনি করে বেজে উঠল তেমনি মিষ্টি মধুর যেন, আর শুনি, আরও শুনি। যেন তোমায় দেখে মনে হয় আরো দেখি, আরো দেখি। যখন দু’টো আয়ত চোখ দিয়ে তাকাও আমার মন বলে- আরও আরও চাও, আরো চাও। তুমি যে এত সুন্দর, তা তুমি নিজে জান না- জান না বলেই তুমি এত সুন্দর। সাগরের গভীরতা সাগর নিজে জানে না বলেই সাগরের এত গভীরতা। চাঁদ নিজেই জানে না চাঁদের এত রূপের কথা। জানে না বলেই সে এত সুন্দর। এই চাঁদ মানুষের মনে জোগায় কত কল্পনার রামধনু। সুন্দরের পুঁজায় মানুষের মনের কত কথা তাদের কাছে বলি। এই চাঁদকে দেখে মানুষ আজও তার রূপ বর্ণনা ব্যাখ্যা করতে পারে নি।
আকাশ কত বড়, কত প্রশস্ত, কত উদার, অনন্ত অসীম, সে নিজের সম্বন্ধে কিছু জানে না বলেই সে এত বিশাল। আকাশের ছোট তারা গুলি কত সুন্দর ঝিমিক্ ঝিক্কিক্ করে জ্বলে আর নিভে হাত ছানি দিয়ে মানুষের মনকে কাছে ডাকে। মানুষ অনাদি অনন্তকাল থেকে তার পানে চেয়ে চেয়ে ভাবছে। অথচ এই তারাগুলো জানে না, তারা এই পৃথিবীতে কত আনন্দ দিচ্ছে, তৃপ্তি দিচ্ছে, জানে না বলেই তারা এত প্রিয়। কাল দেখলাম তোমার গায়ে কোন আভরণ নেই, আভরণ নেই বলে তোমায় বেশী সুন্দর লাগছে। এত সুন্দর তোমাকে আমার কোন দিন লাগেনি। তুমি একবার পাকশী পদ্মার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পদ্মার রূপের সাথে তোমার রূপ একদম মিলে যাবে। সে তোমাকে দেখে বলবে, ওগো তোমার মত আমার একটি মেয়ে ছিল। আমি যখন পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রীজের উপর দাড়িয়ে পদ্মার অথই জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম, তখন দেখলাম পদ্মা অঝোর ধারায় কাঁদছে। আমাকে দেখে চোখ মুছে বলল, তুমি কে গো ? আমি বললাম- আমি ? আমি বিদেশী। এ কথা শুনে সে চমকে উঠে পালাতে চাইল, আমি তার আঁচল টেনে ধরলাম। সে বলল, আমায় ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও। আমি বললাম, না আগে বল, কেন তুমি পালাতে চেয়েছিলে ?
(চলবে———-)।
