লালমোহন আলিয়া মাদ্রাসায় স্বাক্ষর জাল করে ঘুষ বাণিজ্যে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ

ভোলার বাণী রিপোর্ট ॥ ভোলায় জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া রেজুলেশন এবং মোটা অংকের ঘুষ লেন-দেনের মাধ্যমে ২জন প্রভাষক (হাদিস বিভাগ)-এ নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ভোলার লালমোহন উপজেলায়। লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রসার বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারেফ হোসেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ, সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল জালিয়াতি ও ভুয়া রেজুলেশন তৈরী করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন এমন অভিযোগ উঠেছে। কিভাবে ওই দুই শিক্ষক নিয়োগ পেলেন তা সঠিক ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার্থে মাদ্রসার ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী লালমোহন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সূত্রে জানা গেছে, ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসাটি। এরপর থেকে সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানকার অনেক ছাত্র বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী-বেসরকারী কিংবা মাদ্রসায় কর্মরত আছেন। এদিকে সম্প্রতি বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারেফ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলাম ও সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল জালিয়াতি ও ভুয়া রেজুলেশন তৈরী করে মোটা অংকের ঘুষ লেন-দেনের মাধ্যমে হাদিস বিভাগে ২ জন প্রভাষক নিয়োগ দিয়েছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
আরো জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে যে সকল শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ পেয়ে কর্মরত আছেন তাদের প্রতি মাসের বেতন-ভাতার যে এমপিও শীট আসে তাতে হঠাৎ করে ২ জন শিক্ষকের নাম দেখতে পান। এরপরই সকলের মধ্যে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি ও মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্যের চিত্র। অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন পূর্বের অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলাম এবং সেই সময়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তার প্রতিষ্ঠানে হাদিস বিভাগে মোহাম্মদ সেলিম রেজা ও নুর মোহাম্মদ নামে ২জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিভাবে ওই দুই শিক্ষক নিয়োগ পেলেন তা সঠিক ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার্থে লালমোহন পৌরসভার সিরাজ উদ্দিন পন্ডিত নামে এক ব্যক্তি গত ০২/০৯/২০২৫ইং তারিখে জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া রেজুলেশন এবং ঘুষ লেন-দেনের মাধ্যমে ২জন প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহাকারী কমিশনার সাইয়েদ মাহমুদ বুলবুল গত ১৫/০৯/২০২৫ইং তারিখে বিষয়টি অবহিত করে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সরেজমিন তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নিদের্শক্রমে অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী লালমোহন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর গত ১৩ অক্টোবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তারা ওই লিখিত অভিযোগ বলেন, আমরা এ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন যাবত চাকুরী করে আসছি। কিভাবে হাদিস বিভাগে মোহাম্মদ সেলিম রেজা ও নুর মোহাম্মদ নামে ২জন শিক্ষক নিয়োগ পেলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। ইতিপূর্বে যে সমস্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে সেই সকল নিয়োগ সংক্রান্ত সভার রেজুলেশনেও তাদের নাম নেই। যাদেরকে নিয়োগ দেখানো হয়েছে তাদের কাছেও সঠিক নিয়োগপত্র এবং যোগদান পত্র নেই। তাদের দাবীকৃত নিয়োগকাল থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষক হাজিরা খাতায় কিংবা ক্লাশ রুটিনে তাদের কোন নাম অথবা স্বাক্ষর নেই।
তারা আরো বলেন, উক্ত ব্যক্তিদ্বয় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবে কখনো প্রতিষ্ঠানে আসেনি। তারা কখনো শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেনি। মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট মিটিং, পাবলিক পরীক্ষাসমূহের দায়িত্ব পালন, মাদ্রাসার প্রকাশনা, অনুষ্ঠানাদি প্রভৃতি কার্যক্রমে তাদের কোন ধরনের অংশগ্রহণ এবং উপস্থিতি দেখা যায়নি। তা হলে কিভাতে তারা এ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেলেন এটা এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভোলার বাণীকে বলেন, আমার চাকুরী কালিন সময়ে মোহাম্মদ সেলিম রেজা ও নুর মোহাম্মদ নামে হাদিস বিভাগে কোন শিক্ষককে নিয়োগ প্রদান করিনি। কিভাবে তারা নিয়োগ পেলেন, কে তাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন তা আমার জানা নেই। তবে যিনি এ কাজটি করেছেন তিনি আমার এবং সেই সময়কার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে করেছেন, এটা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, আমি যদি এ নিয়োগ দিয়ে থাকি তা যদি তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় তা হলে আমার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তা আমি মাথা পেতে নিব।
কিভাবে ২জন শিক্ষক হাদিস বিভাগে নিয়োগ পেয়েছে সেই বিষয়ে জানতে লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রসার বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারেফ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভোলার বাণীকে বলেন, এই নিয়োগ আমার দায়িত্বকালীন সময়ে হয় নাই। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে, আমি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কোন কিছু করেছি, তা হলে আইন অনুযায়ী যে শাস্তি দেয়া হবে তা আমি মেন নিব। কিন্তু সমাজে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
এদিকে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ বিষয়টি তদন্তের জন্য লালমোহন সরকারি কলেজের প্রভাষক মো: মুসা স্যারকে দায়িত্ব দেন। তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভোলার বাণীকে বলেন, লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ২জন প্রভাষক নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে সকল কাগজ-পত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে মোহাম্মদ সেলিম রেজাকে ২০০৩ সালে এবং নুর মোহাম্মদকে ২০০৭ সালে নিয়োগ দেখানে হয়েছে। ওই দুই শিক্ষক নিয়োগ এবং যোগদানের মূল কাগজ দেখাতে পারেননি, তারা ফটোকপি দেখিয়েছেন। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা যে সকল অভিযোগ তুলে ধরেছেন সেগুলোরও সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা কখনোই প্রতিষ্ঠানে আসেননি, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কোন কার্যক্রমের সাথে তারা জড়িত ছিলেন না এটা প্রমাণিত হয়েছে। আমি তদন্তে যা পেয়েছি, তাই লিখেছি এবং আরো অধিকতর তদন্তের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে পরামর্শ প্রদান করেছি।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।