ফের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ বোরহানউদ্দিনের সেই ‘স্যাকমো’ শফিকুলের বিরুদ্ধে ॥ তদন্ত কমিটি গঠন
(অভিযুক্ত স্যাকমো মো: শফিকুল ইসলাম)

মনিরুজ্জামান ও ইকবাল হোসেন ॥ ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা হাসপাতালের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) মো: শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মনিরুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী রোগী।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বরাবর লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী জানান, ১৬ অক্টোবর সকালে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। এ সময় জরুরী বিভাগে দায়িত্বপালন করছিলেন স্যাকমো সফিক। হাসপাতালে তাকে ভর্তি না নিয়ে জরুরি বিভাগ থেকে দালাল মোসলেমেরর মাধ্যমে কিছু টেস্ট করতে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। টেস্টের রিপোর্ট হাতে আসার আগেই হাসপাতাল থেকে এসে তার নিজস্ব চেম্বার ‘জননী মেডিকেল’-এ নিয়ে ৪টি ইনজেকশন পুশ করান মনিরের শরীরে। পরে একটি প্রেসক্রিপশন লিখে ৩০০ টাকা ভিজিট নিয়ে মনিরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
অভিযোগে আরও বলেন, বাড়িতে যাওয়ার পথে ইনজেকশনের প্রভাবে পথিমধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরে পূনরায় হাসপাতালে আসেন মনির। সেখানে একজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হন। তখন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কৌশলে তার দেওয়া প্রেসক্রিপশনটি ছিড়ে ফেললে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, সফিকুল ইসলাম ৬ এপ্রিল ২০০৮ সালে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে স্যাকমো পদে যোগদান করেন। স্যাকমো হিসেবে শুধুমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বিধান থাকলেও তিনি যেন সব কাজের কাজি। যোগাদানের পর থেকেই একাধিক দালালের মাধ্যমে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেল। এদের মাধ্যমে গ্রামীণ সহজ-সরল মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলে ওদের খপ্পরে পরেন। নানাভাবে বুঝিয়ে রোগিদের সফিকের চেম্বার নিয়ে আসেন। ফলে অপচিকিৎসার শিকার হন রোগিরা। এক কথায় বিতর্ক এখন তার নিত্যসঙ্গী।
বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা যায়, হাসপাতালের ডাক্তারগণ জটিল রোগিদের যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র প্রেরণ করেন। তাদেরকে তিনি তার চেম্বার নিয়ে চিকিৎসা দেন। ফলে অপচিকিৎসার পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন রোগিরা। এছাড়াও স্যাকমো শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের জিম্মি করে দালালের মাধ্যমে কৌশলে নিয়ে আসেন তার ব্যক্তিগত চেম্বারে। সেখানে করা হয় টেস্ট বাণিজ্য। তার টার্গেট থাকে গ্রাম থেকে আশা সহজ-সরল মানুষরা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মনিরকে শুধু টেষ্ট করতে দেওয়া হয়েছে। তাকে ইনজেকশন বা কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। শিশু তানভীরের মৃত্যুতে তার সঙ্গে আকিব নামের এক ফার্মেসি ব্যবসায়ীকেও আসামি করা হয়েছে। ওই মামলার বাদিকে উভয়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমঝোতায় আসেন এবং মামলা থেকে মুক্ত হন। এরপর আকিব তার পরিশোধিত টাকা তার কাছ থেকে ফেরত চান। ওই টাকা না দেওয়ায় সেই শত্রুতার জেরে আকিব মনিরকে দিয়ে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ করছে বলে জানান তিনি। তবে আকিব এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি সফিকের কাছে পাওনা টাকা পাব, সেটা চাচ্ছি। এর সাথে অপচিকিৎসা কিংবা অভিযোগের কোন সম্পর্ক নাই।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. কে এম রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার (২৫ অক্টোবর) ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী শনিবার তদন্তের রিপোর্ট প্রদান করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যত্যা পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত চলছে, অভিযোগের সত্যত্যা পেলে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য এর আগে, তার ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তানভীর হাসান নামের ৮ বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারান। চলতি বছরের ১৯ জুলাই জ্বর জনিত কারণে তার কাছে নিয়ে আসলে শিশুটির শরীরে ডেঙ্গু হয়েছে জানিয়ে একসঙ্গে ৪টি এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন পুশ করেন অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম। পরে তার শরীর ফুলে অস্বাভাবিক হয়ে যায় এবং কালো বিচি উঠে হাত পা পুড়ে যায়। চিকিৎসার স্বার্থে শিশুটির দুটি হাত ও পা কেটে ফেলা হয়। পরে টানা ৪ মাস চিকিৎসা শেষে শিশুটি মারা যায়। অপচিকিৎসার অভিযোগ এনে শিশুটির পরিবার একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় দীর্ঘ ১ মাস জেলও খাটেন শফিকুল। পরে শিশুটির পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন। সেই ঘটনার পর ফের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী মনিরুল ইসলাম ও প্রাণ হারানো শিশুটি বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাসিন্দা।
