রক্তঝরা দিনগুলি-পর্ব-০৪

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত পর্বের পর) : তিনি আমাকে বললেন, শুনলাম আপনি নাকি ক্যাপ্টেন ? বললাম-হ্যাঁ। কীভাবে ক্যাপ্টেন হলাম তা জানতে চাইলে বললাম- আমি পিডব্লিউএনজি এর ক্যাপ্টেন। মেজর ডেভিডসান (ইউএসএ) আমাকে ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি বললেন, আপনি একজন ক্যাপ্টেন ? তাহলে বসে আছেন কেন ? দেখছেন দেশের দুর্দিন, মেয়েদের রাইফেল ট্রেনিং দেন। যেন মেয়েরা শুধু গুলি খেয়ে না মরে, দু-একটাকে মারতেও পারে। পরে চলে আসার সময় তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। যখন জানতে পারলেন, খাঁন বাহাদুর নূরুজ্জামান আমার বাবা। তখন তিনি আরও বেশি প্রফুল্ল হয়ে বললেন, আপনি খাঁন বাহাদুর সাহেবের মেয়ে ! আপনি এমন একজনের সন্তান। হ্যাঁ, আপনিই পারবেন। আপনাকেই দায়িত্ব দিলাম। তিনি আমাকে সাজেদা চৌধুরীর বাড়িতে মেয়েদের ট্রেনিং দেয়ার কথা বললেন।
আমি তখন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ‘মরিচা হাউজে’ এসে দেখলাম অনেক মেয়ে। ১৬ থেকে ২২ বছরের মেয়ে সবাই দেশকে ভালোবেসে, দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চায়। কিন্তু রাইফেল মাত্র ৩০টি। সবাই বলে আমি আগে শিখব, আমাকে রাইফেল দেন। ভীষণ মুশকিলে পড়লাম। সবাই হুলুস্থুল করছে। আমি মেয়েদের বললাম, শৃঙ্খলাই জীবন। তোমাদের দেখে আমার একটি গল্প মনে পড়ছে। ‘একদিন এক ব্রাহ্মণ খালি গায়ে গাঁয়ের পথ ধরে চলছিল। হঠাৎ ভূতের সাথে দেখা। ভূত বলল, ঠাকুর কোথায় যাচ্ছ ? ঠাকুর বলল-যা, বিরক্ত করিস না। আমার কাজ আছে। ভূত বলল, কি কাজ আমাকে বলতে হবে। ঠাকুর বলল, একটা মানুষের শ্রাদ্ধ করতে যাচ্ছি। ভূত বলল, শ্রাদ্ধ কী ? তখন ঠাকুর বলল, মানুষ মরে গেলে আমরা হিন্দুরা শ্রাদ্ধ করাই। তখন ভূত বলল, আমিও আমার বাবার শ্রাদ্ধ করব। একথা শুনে ঠাকুর বলল-বেশ। আয়োজন কর, করে আমাকে ডাকসি। সপ্তাহ খানেক পর ভূত আসল। তারপর বলল, চল ঠাকুর সব আয়োজন শেষ। ঠাকুর গিয়ে দেখল হাজার হাজার ভূত মাঠে। সবাই তার বাবার শ্রাদ্ধ করতে চায়। তারা রীতিমত ঝগড়া শুরু করে দিল। ঠাকুর দেখে ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
মেয়েরা গল্প শুনে খুব হাসল ও লজ্জা পেল। বলল আপনি যেভাবে ভাল হয় সেভাবেই করেন। আমি তখন ১৬ থেকে ২২ বছরের ময়েদের আলাদা করে লিষ্ট করে নিলাম। একটা একটা করে প্লাটুন ট্রেনিং দিচ্ছিলাম। ৩০ জনে এক প্লাটুন। ট্রেনিং দেয়া যে কী পরিশ্রমের কাজ। আমার মাথার ঘাম পায়ে পড়েছে। একদিন আইভ রহমান আমাকে বলল, আপতি এত কষ্ট করে ট্রেনিং দিচ্ছেন, আপনার কী লাভ ? সত্যিই তো আমার কী লাভ ? আমাকে কেউ চা-ও খাওয়ায় না, এক গ্লাস পানিও দেয় না, ড্রইং রুমেও ডেকে নিয়ে যায় না। কিন্তু আমি বললাম লাভ তো কিছু নেই। আমি দেশকে ভালোবাসি। তাই বঙ্গবন্ধুর আদেশে আমি এসব মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে আমার শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছি। আমাদের দেশের জন্যই আমার এক কষ্ট। অন্য কোন কার নেই। এরই মাঝে ২৩ শে মার্চ নির্দেশ পেলাম, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দিতে হবে। বেছে বেছে ২শ’ মেয়ে নিয়ে সেই বিশাল রাস্তা ধরে হাতে ৩০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে সামনে কমান্ড করে চললাম।

(চলবে———–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।