রক্তঝরা দিনগুলি : পর্ব-০২

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত পর্বের পর) :

রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে
বাংলাদেশের দাবী যে,
শন্তিসুধা, স্নিগ্ধ বারি
মায়ের মতো পাবি রে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে
বাংলাদেশের দাবী রে।

লড়তে হবে-লড়বি, ভয় কী স্বাধীন দেশে
নাওজোয়ানের নর তোরা দিগি¦জয়ী বেশে।
এগিয়ে চল, এগিয়ে চল
শাসনতন্ত্রের কাছে
বাংলা ছাড়া বাঙ্গালির আরকী তাদের আছে ?

বৃটিশ যখন এলো
ইংরেজী হলো ভাষা
দুইশ জনের মধ্যে
একশজনই চাষা।

ভাবলাম বুঝি, এই ফুটবে মুখের ভাষা
চলব স্বাধীন ভাবে, পূরবে মনের আশা।
বাংলার দাবী দাওয়া
মানতে সকলে বাধ্য
রাষ্ট্রভাষা ? বাংলা হবে
ফেলবে কার সাধ্য ?

সকল দেশের লোক
শুনবে যখন তারা
বাঙালীর শৌর্যে বীর্যে
হইবে আপন হারা।

বাংলা ভাষা আমাদের
মায়ের মতই মায়া,
স্নেহশীলা গরিয়সী
চলার পথের ছায়া।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে বাংলাদেশের দাবী রে।
শান্তিসুধা স্নিদ্ধ বারি মায়ের মতো পাবি রে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে বাংলাদেশের দাবী রে।

আমি নিজেও একজন ভাষাপ্রেমী, দেশপ্রেমী। তাই আমি প্রতিবাদমুখর হয়েছিলাম। আমার এই কবিতাটি প্রকাশের পর দেশের লোকদের মধ্যে একটা হৈ-চৈ পড়ে গেল। শত্রুরাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দেশের অবস্থাটা এমন হল যেন গরম তেলের মাঝে এক ফোটা পানি পড়ল। তোলপাড় হল আমাকে নিয়ে। কারণ আমি ছিলাম এ কবিতার রচয়িতা। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল। পরে অবশ্য আমার শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে ছাড়া গেলাম। কিন্তু আমার পেছনে পুলিশ ছায়ার মতো লেগে গেল। কোথায় যাই, কি করি, কি বলি, এমনিক বাড়ীতেও পাহারা পড়ল। আমার কারণে আমার স্বামীর চাকরিতেও অনেক সমস্যা হল। কারণ তিনি তখন খুলনা জেলার ফার্ষ্টক্লাস ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। এ কারণে স্বামীর অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমার ছেলে-মেয়েরাও আমার এসব কাজ পছন্দ করত না। কিন্তু তবুও আমি আমার কাজ বন্ধ করিনি।
২১ শে ফেব্রুয়ারী সারা দেশে হরতাল ডাকা হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় ঢাকার সর্বত্র ১ মাসের জন্য হরতাল, সভা, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। এত বাধার মুখেও ২১ তারিখের হরতাল সফল করার জন্য ১৪৪ ধারা ভেঙেই চলছিল। ঠিক এরকম অবস্থায় উস্কানিমূলক ভাবেই ছাত্র মিছিলের উপর গুলি চালানো হয়। ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও কয়েক তরুণের তাজা প্রাণ। ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হল। হত্যাকান্ডের এই খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষের মিছিল সমাবেশে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। যখন গুলি হয় তখন পরিষদ ভবনে চলছিল ইষ্টবেঙ্গল লেজিসলেটিভ এসেম্বিলির বাজেট অধিবেশন। বিকাল সাড়ে ৩টায় অধিবেশন শুরু হলে স্পিকার আবদুল করীম আসন গ্রহণ করা মাত্র দাঁড়িয়ে যান মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীস। তিনি দাবী করেন যে, অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে লিডার অব দ্য হাউস অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনকে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। হতাহত ছাত্রদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে এসে পরিষদে বিবৃতি দিতে হবে। কিন্তু, তার সে দাবীর প্রতি কর্ণপাত করা হয়নি।

(চলবে———-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।