মধ্যরাত : পর্ব-২৮৫

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : এতদিন বা এ কয়দিন মন্ট্রিলে আমার কেউ আছে, সব ভুলে বসেছিলাম। মনে মনে ভাবলাম আমাকে কর্তব্যচ্যুত হলে চলবে না। ভার্সিটিতে একটা দরখাস্ত রেখে এসে ছিলাম। অনুমতির জন্যও অপেক্ষা করিনি। জানি ছুটি-ত আমি নিই না, ছুটি হবে। আমি নাশতা সেরে হসপিটালে যাবার জন্য তৈরী হলাম। গাড়ী ডোরার দুয়ারে ছিল, ইরাকে নিয়ে উপস্থিত হলাম। নীচ তলায় গিয়ে লিফটে উঠলাম। ১০ তলার উপর হসপিটাল। ডোরার রুমে ঢুকে দেখি ডোরার অবস্থা শোচনীয়। বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ইরা দিদি বলে ঝাপিয় পড়তে চাইল। আমি দু’হাত দিয়ে ঠেকালাম। আমি কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলাম ডোরা। ওর দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পরতে লাগল। ইরাকে দেখে চিনল, কাছে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকল। মুখের কাছে মুখ নিয়ে দু’বোন খুব কান্নাকাটি করল। ইরা বলল, দিদি কলকাতায় যাবে না ? মাসিমা যেতে বলেছে। ডোরা মাথা নেড়ে বলল সে কলকাতায় যাবে। মারিয়া ইরাকে ডেকে হসপিটালের বারান্দায় নিয়ে গেল। বলল, ও এ রকম করলে রোগী এখনই হার্টফেল করবে, একটু ধৈর্য্য ধরুন।
আমি ডাক্তার ও নার্সের সাথে পুঙ্খানু পুঙ্খ রুপে ডোরার রোগের ব্যাপার নিয়ে দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর আলাপ ও আলোচনা চালালাম। ডারক্তাররা বলল, যে ম্যাননজাইটিস। জ্বর চলছে বহু দিন, দেরী করে হসপিটালে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা অনেক বোর্ড গঠন করেছে, এ রোগের প্রতিকার করার জন্য। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না বোধ হয়। ডোরার আত্মীয়-স্বজন কারো সাথে আমার তেমন পরিচয় ছিল না বা আমি কাকে তেমন চিনি না। তবু ইরাকে কাছে ডেকে চুপে চুপে বললাম, তোমার মা-বাবা নেই আমি জানি। মাসিমা-মেসো ? বা পিসীমা ? তেমন কেউ আছে কি ? ইরা বলল, মাসিমা এখনও বেঁচে আছেন, কিন্তু মেসো নেই। আর আমারও স্বামী নেই, ছেলে নেই। নিজে বেথুনে প্রফেসারী করে বেঁচে আছি। খাই, ঘুমুই, মাঝে-মধ্যে ছুটির অবসরে দার্জ্জিলিং কিংবা কাশ্মির-দিল্লী-আগ্রা ঘুরে আসি। দিদি অনেক বার বলেছে এমেরিকা আসার জন্য। আমার আবার নিজের কোলকাতা ছেড়ে এমেরিকা, কানাডা ঘোরার তেমন মোহ নেই। তবে মাসিমাই বাবা-মা চলে যাওয়ার পর আমাদের দেখা-শুনো ও পড়ালেখা করিয়েছেন। ইশ্বর এখনও ওনাকে রেখেছেন আমাদের খোঁজ-খবর রাখবার জন্য।
ইরার দু’চোখ জলে ভরে এল। শেষ পর্যন্ত আমি এলাম দিদিকে শেষ দেখা দেখার জন্য। প্রশান্ত দা আমার দিদি ভালো হবে না ? আমি বললাম, ভালো হবে। বলে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাবার জোগার হয়ে গিয়েছে। নিজকে কোনরকমে সংযত করে একটু দূরে সরে গেলাম। ডাক্তাররা ডোরার হাতে স্যালাইন প্রয়োগ করল। ডোরা চোখ মেলে আমার পাশে, ইরার দিকে চেয়ে চোখের জল ছেড়ে দিল। কথা বলতে পারছে না। অনেক কথা বলার ছিল আমাকে, কিন্তু বলতে পারছে না। বলতে পারছে না দেখে আমি আর থাকতে পারলাম না। ওর কাছ থেকে গিয়ে রোগীদের গেষ্টদের ড্রইং রুমে অনেকক্ষণ মনের মত করে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। ডোরার অনেক স্মৃতি, সেই বরিশালের বি.এম কলেজের আকর্ষণীয় সিরাজ-উ-দৌলা নাটকের আলেয়ার অভিনয়ের কথা মনে পরল। ডোরা আলেয়ার ভূমিকায় অদ্ভুত অভিনয় করেছে। আমি সিরাজের অভিনয়ে অংশ নিয়েছিলাম। তারপর থেকে আমরা দু’জন দুজনের অনেক অনেক কাছে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বি.এ পাশ করার পর কে কোথায় ছিটকে পরলাম আর বলতে পারলাম না। সুদীর্ঘ জীবনের তারই উৎরাই করে ডিজনী ওয়ালর্ডে সিনডারেলা ক্যাসেলে ডোরার সাথে চকিতে আমার আবার চাক্ষুস পরিচয় হয়। আর দেখা না হওয়াই বোধ হয় অনেক ভাল ছিল। তারপর আবার আমার সোথে চিঠি লেখা, ওর মন্ট্রিলে কিচু সময় কাটানো আমার কাছে। আমি ভার্জিনিয়ায় এসে ওকে ও ডোরা সুশান্ত উমাকেসহ ওয়ার্ল্ড ডিজনীতে যাই। তারপর চলল দু’জনের মান-অভিমান, কথা-কাটাকাটি। ও এগিয়ে এলে আমি পিছিয়ে যাই। ও পিছিয়ে গেলে আমি এগিয়ে যাই। তাও আমার মনে হত ও আমার একান্ত কাছে আছে।
(চলবে——-)
