সর্বশেষঃ

মধ্যরাত : পর্ব-২৮১

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন), 

(গত পর্বের পর) : তখন ঘড়িতে ১২টার কাটা ঘুরছিল। আর দেরী না করে পাশে একটা বেড তৈরী করা ছিল, তাতে শ্রান্তিতে ক্লান্তিতে গা এলিয়ে দিলাম। ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে এল। তখন মনে হয় আমি কিছু মুখে দেইনি। আবার উঠে গিয়ে একটু ব্রেড মুখে তুলে গ্লাস ভরে জল খেয়ে এলাম। শুয়ে শুয়ে অনেক কথা মনে হল। এত তাড়াতাড়ি কেমন করে সব গোছগাছ করে এখানে এলাম এবং ডোরার কাছে ডোরার পাশের বেডে শুয়ে আছি, এ যেন ভাবতে আমার কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। মনে হয় অলীক, স্বপ্ন। আলাদ্দীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের মত। এ এক নিগুড় প্রেম, গভীর সুপ্ত ভালবাসা। সে ভালবাসার চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, দাবী নেই, জোর নেই, অধিকার নেই, অনধিকারও নেই। তবুও চুম্বকের মত প্রবল আকর্ষণে সমুদ্রের জোয়ারের মত কাছে নিয়ে আসে।
ঘুমিয়ে গেলাম গভীর ঘুম। এ ঘুম যেন আমার কত জীবনের, কত সাধনার একটি রাত ডোরার পাশে বিনা অধিকারে ঘুমিয়ে থাকা। অধিকার কেউ কাউকে দেয়না, অধিকার নিজ থেকে আদায় করে নিতে হয়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম, আমি আর ডোরা এক অলীক স্বপ্নের দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কত ফুল, রাজ্যের ফুল যেন ফুলঝুরির দেশ। ডোরা আর আমি হাত ধরাধরি করে হাটছি। আর ঘুরছি, না বলা না জানা কত কথা, বলে বলে শেষ করতে পারছি না। হাঁটতে হাঁটতে এক বিশাল সমুদ্রের কাছে এসে দাঁড়ালাম। উচু উচু ঢেউগুলি আমার পায়ের কাছে পরে আর্তনাদ করছে। একটা মস্ত ঢেউ পাহাড়ের মত উচু হয়ে এসে ডোরাকে আমার কাছ থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আর্তচিৎকার করে জলে ঝাপিয়ে পরলাম। ঘুম ভেঙ্গে গেল, ডোরা বোধ হয় আমার চিকৎকারে জেগে উঠল। তখনও শুয়ে শুয়ে ডোরার জন্য কাঁদছিলাম। ডোরা আমাকে ক্লান্ত স্বরে ডাকল প্রশান্ত, প্রশান্ত কি অমন করছ কেন ? আমার কাছে এস। আমি লজ্জা পেলাম, আমার দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়াতে বললাম, না কিছু না। একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম। তাই, ডোরা বলল-আমি কত দেখি, কাকে বলব। বলার কেউ নেই, তাই কাউকে বলি না।
আমি কতক্ষণ চুপ করে দম নিলাম। তখন মধ্য রাতের নাম না জানা কতগুলো পাখি ডানা ঝাপটিয়ে অনন্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। জানালার ফাঁকদিয়ে বড় বড় কাঁচের জানালার মধ্য দিয়ে দেখলাম একখানা সপ্তর্ষি অনন্ত প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে। এই বিশাল প্রকৃতির সুপ্তনিদ্রিত রাত্রিকে। গভীর রাত, ডোরার ঘরের বড় ঘড়িটায় ঢং ঢং করে রাত ৩টার প্রহর ঘোষণা করল। ডোরা ডাকল প্রশান্ত তুমি কি ঘুমিয়ে পড়লে ? আমি ঘুমুইনি। আচ্ছন্নের মত এই মধ্য রাত্রির নীলাখেলা অনুভব করছিলাম। ডোরার ডাকে আস্তে আস্তে ওর কাছে গিয়ে দেখলাম ভীষণ জ্বর। জ্বরের চোটে গা পুড়ে যাচ্ছে। ডোরা জল খেতে চাইল, জল ঢেলে খাইয়ে দিলাম। মাথায় আইস ব্যাগটা দেবার জন্য ফ্রিজ থেকে বরফ বের করলাম। বরফ ভরলাম, আবার মাথার কাছে এসে মাথায় আইস ব্যাগ ধরলাম। ও এতক্ষণ ছট-ফট করছিল, তবু আমাকে ডাকেনি। জোর করেনি, ওর কাছে আসার। রাগ হল, বললাম- ডোরা, এতজ্বর ডাকনি কেন ? ডোরা বলল- তুমি এতদূর থেকে এসেছ, ক্লান্তিতে শ্রান্তিতে একটু চোখের পাতা এ করেছ। আমি কোন আহম্মকের মত তোমাকে ডাকি। আমি বললাম- এখন তুমি অসুস্থ্য, এখনকি এসব ভাদ্রতা, সভ্যতা, সামাজিকতা সাজে ?

(চলবে———–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।