মধ্যরাত : পর্ব-২৮০

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত পর্বের পর) : সারা পথে ডোরার অনেক স্মৃতি, মন নেওয়া এবং দেওয়ার অনেক ঘটনা বার বার আমার হৃদয়ের মাঝে উকি দিল। একবার গিয়েছিলাম সুশান্ত-উমা, দোলাকে নিয়ে ডিজনী ওয়ালর্ডে। যাওয়ার পথে তখন আনন্দে উল্লাসে মন নাচছিল, আর আজ ? ডোরার অসুস্থ্যতার কথা শুনে, অসুখ সুনলেই আমার ভয় হয়, সুশান্ত এক অসুখ অসুখ করে চলে গেল। সে অবধি কারও অসুখ দেখলে নানা দুর্ভাবনায় আমি ব্যকুল হয়ে পরি। আজও নানা দুর্ভাবনায়, নানা অশুভ চিন্তায়, আমি বাসে উঠে বসলাম। বাস উল্কার মত ছুটে চলল। নানা জংশনে থামল, কিন্তু কখন যে ভার্জিনিয়ায় গিয়ে পৌছবে সে আমার মনের জিজ্ঞাসা। তবু শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার কিছু আগে ভার্জিনিয়ায় বাস থামল।
আজ আর আমার জন্য কেউ এলনা। কে আসবে, আসবার যে ছিল সে রোগশয্যায়। তবু বাসে করে ডোরার বাসার কিছু দূরে গিয়ে বাস স্টপেজে বাস থামল। আমি হ্যান্ডব্যাগ হাতে করে দরজায় এসে কলিং বেল চাপলাম। অনেকক্ষণ পর একটি সাদা মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। আমি চমকে উঠলাম, সে বলল তুমি কে ? আমি বললাম, বন্ধু। ও বলে আমায় বসতে বলল বেডরুমে গিয়ে। আবার ফিরে এল, বলল ভেতরে এস। আমি ভেতরে গিয়ে একক্ষীণকায়া ডোরার কঙ্কালসার দেহ খানা দেখে মাথায় কপালে হাত বোলালাম, দেখলাম ওর দুচোখ গিয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পরছে। আমার হাতের পরে ও হাত খানা রাখল। গায়ে তখন প্রচন্ড জ্বর ছিল। আমি ওর হাত খানা আস্তে বালিশের পর নামিয়ে রাখলাম। পাশে ছোট একখানা টেবিলের পর ছোট ছোট শিশিতে ওর অনেক ঔষধ-পত্র পরেছিল। সেগুলি নেড়ে চেড়ে দেখলাম। আস্তে আস্তে ডাকলাম, ডোরা। ও দুচোখ খুলে আমার দিকে চেয়ে বলল প্রশান্ত তুমি এসেছ ? সত্যি এসেছ ? আমি বললাম, কি চোখে দেখেও বিশ্বেস হচ্ছে না। বলল কি আমার ভয় ছিল তুমি হয়ত আসবে না। আমি বললাম, এরকম বদ্ধমুল ধারনা তোমার কি করে জন্মাল ? ডোরা বলল, জানি না, জানি না বলেই একপাশ হল। আমি জোর করে আমার দিকে ফেরালাম, দেখলাম জ্বরের তাপে ঠোট দুটো কাঁপছে। থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখলাম একশ পাঁচ। মাথার কাছেই আইশ ব্যাগটা ছিল। তা ওর মাথায়-কপালে ছোঁয়ালাম। এ একটু আরামে চোখ বুঝল। আমি ওর একখানা হাত নিয়ে নাড়া চাড়া করলাম। ডোরা মারিয়াকে ডেকে বলল, আমার ঔষধ পত্র খাওয়ার কথা আমার বন্ধুকে বলে যাও।
মারিয়া রাত্রে বাড়ী যেতে চাইল। ডোরা বলল, কয়েক রাত জাগতে কি তোমার অসুবিধা হয়েছে ? ও হেসে বলল, না তুমি বললে আজও থাকতে পারি। ডোরা বলল, না আজ বাড়ী যাও। কল সকালে এস কেমন ? মারিয়া হাসি হাসি মুখে বলল, ধন্যবাদ। সত্যি এসব মেয়েরা কত স্মার্ট, কত সহজ-সরল, অনাড়ম্বর যাপন করে। দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, হতাশা নেই, ব্যর্থতা নেই। যেন উচ্ছল জোয়ারের মত। আমি অনেকক্ষণ ডোরার কাছে বসে বসে ঘুমে ঢুলছিলাম। ডোরা বলল, প্রশান্ত ঘুমুও গিয়ে। আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, নানা এই বেশ আছি। তুমি কি খাবে ডোরা, ডোরা বলল- অরেঞ্জ জুস আর কিছু না। ডোরা বলল, প্রশান্ত তুমি কিছু খাও। আমি অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বে উঠে গিয়ে ফ্রিজ থেকে মাখন ব্রেড বের করে, বাথরুমে গিয়ে ওয়াসিং এর কাজ সেরে কাপড়-চোপড় পরিবর্তন করলাম। হাত-মুখ ধোলাম। আবার ডোরার কাছে এলাম। দেখলাম মাথায় হাত দিয়ে জ্বরের তাপটা কিছুটা কমে এসেছে। ডোরা ঘুমিয়ে গেছে ? যেন পরম নিশ্চিন্তে, পরম আরামে ও আশ্বাসে সে চোখ দুটি বন্ধ করে আছে। মুখ খানা হাসি হাসি, চোখের বড় বড় পাঁপড়ি গুলি তেমনি সুন্দর, মুখের উপর মেলে আছে। অধর দুটি তেমনি আজ কমলা লেবু কোষের মত টল টল করছে। বড় বড় দুটি চোখের পাতা। আমি অনেক প্রাণ ভরে ওকে দেখলাম। এ মুখ আমার আজন্মের ইষ্পিত ও আকাঙ্খার বস্তু। এত অসুস্থ্যতার ভিতর ও যেন কত সুন্দর, কত নিষ্পাপ, কত পবিত্র, কত নিস্কলুনস। দেখে দেখে যেন আমার চোখ ভরে জল ছাপিয়ে এল। জাগাতে সাহস পেলাম না। ও ঘুমুক, কত রাত বোধ হয় ঘুমুইনি, কতদিন কতরাত বোধহয় ও অসুস্থ্যতার ভিতর একাকী দিন কাটিয়ে আমার পথের দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে ছিল। হায় ভগবান একে বলে ভালবাসা—-প্রেম।

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।