মধ্যরাত : পর্ব-২৭৫

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন), 

(গত পর্বের পর) : আমি বললাম, আর্কিড তোমার দেশ কোথায় ? কোথা থেকে এই সাত সমুদ্র তের নদীর পাড়ে এসেছে। বাবা, মা, আত্মীয়-স্বজন হারা যায়। গভীর দুটি কালো চোখ আমার দিকে তুলে ধরল। আমিও ওর চোখ দুটু লক্ষ্য করে তাকিয়ে থাকলাম। মেয়েটি কেঁদে ফেলল। অনেক ক্ষণ কাঁদল। বলল দাদু বড় কষ্ট, বড় ব্যথা, বড় দুঃখ সব হারানোর দুঃখ। উমা এসে কাছে বসে মাথায় হাত বুলোতে লাগল। অর্কিড উমার বুকে মাথা গুজে বলল, উমাদি আমার কেউ নেই, কিছু নেই। উমা বলল, বল বল তোমার এত দুঃখ কিসের ? হেমন্ত এতক্ষণে মুখ খুলল- বলল অর্কিড এখানে কনকরডিয়াতে এম, এস, এ ভর্তি হয়েছে। ওর বাবা সদ্য মারা গেল, মা অনেক দিন আগেই গত হয়েছে। ভাইরা সকলে উচ্চ শিক্ষিত, বোনদের সব বিয়ে হয়েছে, দুভাই নিয়র্কে আছে ডক্টরেট ইকনমিকসে। কিন্তু অর্কিড বছর খানেক আগে বিয়ে করেছিল। স্বামী ওকে মার ধোর করে। অসভ্য গালাগাল দেয়, ঘৃণা; অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলে। ওর বাবা, মা, ভাই, বোন কাকেও সম্মান করে কথা বলেনা, বা বলতে জানেনা।
মাঝে-মধ্যে এরকম মার দেয়ে যে অর্কিডকে দু’ঘণ্টা অজ্ঞান অবস্থায় থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত বহুত্যাগ-তিতিক্ষা, সংযম আর রাখতে ও পারেনি। ওর ভাইরা ওর স্বামীকে এমেরিকা এসে পি.এইচ.ডি করার প্লেন খরচও দিল। অর্কিড নিজে এমেরিকায় এক বছর চাকরী করে খাইয়েছে ও এপার্টমেন্ট ভারা দিয়েছে। মাঝে মাঝে ওর স্বামী ছোঁড়া হাতে বলে, তোকে শেষ করে তোর ভাইদের একটা একটা শেষ করব। হেমন্ত এক নিশ্বাসে এতগুলি কথা বলে গেল। বলার মধ্যে কোন দম নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে নাই। আর অর্কিড মাথা নীচু করে ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা দিয়ে ড্রইং রুমের কার্পেটের সুতাগুলি খুঁটছিল। আর ফুলে ফুলে চুপে চুপে চোখের জল অবিরল ফেলছিল।
আমার তখন আর চা মুখে যাচ্ছিল না। মেয়েটির ব্যথা ভরা সজল কাজল দুটু চোখের জল আমার সকাল বেলার সকল শান্তি নষ্ট করে দিল। আমি কথা বলতে যেন ভুলে গেলাম। আমার যেন ভাষা মুক হয়ে গেছে, আমি খালি বার বার মেয়েটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত ¯েœহ সুলভ দৃষ্টি দিয়ে গেলাম। অর্কিড বলল, উমাদি, আমি সবশেষ করে দিয়ে আসছি। আমার মনে হয় আমার জীবনের সব শেষ হয়ে গেছে। উমা বলল, অর্কিড ধৈর্য্য ধর। আমরা-ত রয়েছি, তুমি আমার কাছে এস। আমার আজ ছেলে মেয়ে যদি ঠিক মত হোত, তাহলে বোধ করি তোমার মত একটা মেয়ে আজ আমার থাকত। তুমি আমার মেয়ে, তোমার মা নেই, দুঃখ করোনা-ত। পৃথিবীতে কাহারো বাবা-মা, চিরকাল বেঁচে থাকে না।

(চলবে——–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।