ভোলার মেঘনার পাড়ে মরুভূমি, গরিবের দুবাই

শিমুল চৌধুরী ॥ ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের রতনপুর বাজার থেকে কিছুদূর শান্তিরহাট এলাকায় গিয়ে বেড়িবাঁধের উপর দাঁড়ালেই চোখে পড়বে মেঘনা নদী। তীরে এসে আছড়ে পড়ছে নদীর ঢেউ। এর পাড় ঘেঁষেই দেখা যাবে বিশাল এলাকাজুড়ে বালু আর বালু। এ যেন বালুর মাঠ। মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বেশ কয়েকটি খেজুর গাছ।
একদিকে মেঘনা নদীর বড় বড় ঢেউ, অন্যদিকে মরুভূমির মতো কয়েক মাইল এলাকাজুড়ে বালু। চারিদিকে খোলা জায়গা। দখিনা বাতাস। সারি সারি খেজুর গাছ। এই সৌন্দর্যে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই। দেখতে ঠিক যেন আরব্য মরুভূমি। এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর দুরান্ত থেকে ঘুরতে আসেন বিভিন্ন বয়সী এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার হাজার হাজার মানুষ। কেউ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসছেন। কেউ আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে আসছেন। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করছেন। ছবি তুলছেন আর খেলাধুলা করছেন। মেঘনা নদীর পাড়ের এই জায়গাটি এখন দর্শনীয় স্থানে রুপ নিয়েছে। আগন্তুকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে গরিবের দুবাই নামে। কেউ বলছেন ভোলার মরুভূমি। তাইতো যারা এখানে ঘুরতে আসেন তারা সবাই ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে লিখছেন আমরা এখন ভোলার মরুভূমিতে। একই জায়গায় ছবি তুলে নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে অনেকে লিখছেন আমরা এখন আরবের মরুভূমিতে আছি। সদরের বাইরে থেকে বালুর মাঠে এসে সেখান থেকে ফিরে কেউ কেউ আবার লিখছেন ঘূরে এলাম দুবাই থেকে।


গত বুধবার (৩১ মে) দৌলতখান থানার ওসি মোঃ জাকির হোসাইন শিবপুরের শান্তিনগর এলাকায় এসে স্বপরিবারে ঘুরে তিনিও ছবি তুলে তার আইডিতে লিখেছেন ’ঘূরে এলাম দুবাই থেকে’। এ স্পটটিকে ঘিরে গরিবের দুবাই নামে পরিচিত সেই বালুর মাঠে ছোট ছোট বিভিন্ন দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকানে চা, পান, সিগারেট, চিপস ও ফুসকা বিক্রি হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে সেই বালুর মাঠে একঝাঁক সংবাদকর্মী নিয়ে ঘুরতে এসে নদীর পাড়ের তাজা ইলিশ মাছ ভাজা ও রান্না করে খাচ্ছেন আর আনন্দ করছেন ভোলার স্থানীয় দৈনিক ভোলার বাণী পত্রিকার সম্পাদক মোঃ মাকসুদুর রহমান। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ভ্রমন পিপাসূদের জন্য আকর্ষণীয় স্পট শান্তির হাটের বালুর মাঠ। এ যেন প্রকৃতির অপরুপ ছোঁয়া। এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হলে পরিবার পরিজন নিয়ে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটানো যেত বলেও মনে করছেন তিনি।


শুক্রবার বিকেলে ওই স্পটে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করছে। কয়েকজন তরুণ বালুর মাঠে ফুটবল খেলছে। বিভিন্ন বয়সী শিশু, নারী ও পুরুষরা ভিড় জমিয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ ছবি তুলছেন। কেউবা লাইভ করছেন। খোলা মাঠে বইছে দখিনা বাতাস। তীরে এসে আছড়ে পড়ছে নদীর ঢেউ। এমন অপরূপ দৃশ্য আর মনোরম পরিবেশ টেনে নিয়ে আসছে দর্শনার্থীদের।
স্থানীয়রা জানান, চায়নারা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শান্তিরহাটে মেঘনা নদীর তীরে একটি প্রকল্প গ্রহন করেন। যেখানে ইপিজেডসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হবে।এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত প্রায় চার বছর আগে এই এলাকায় প্রায় দেড় শতাধিক একর জমি ক্রয় করে। গত প্রায় ৬ মাস আগে ওই এলাকাটিকে মেঘনা থেকে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সেই বালু দিয়ে ভরাট করে। ফলে এলাকাটি বর্তমানে বালুর মাঠে পরিনত হয়েছে। এরপর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। তারা বালুর মাঠে সারি সারি খেজুর গাছ আর মেঘনা নদীর ঢেউসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। ছবি তুলে নিজেদের ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। এ এলাকাটি দর্শনার্থীদের কাছে এখন আকর্ষনীয় স্পটে পরিনত হয়েছে। তারা আকর্ষনীয় ও দর্শনীয় এ স্পটের নাম দিয়েছেন ’গরিবের দুবাই’। গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শান্তির হাটের বালুর মাঠ এলাকায় মানুষের যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে।


বালুর মাঠে অবস্থিত ফুসকা দোকানি সাগর বলেন, আমার বাড়ি শিবপুর ইউনিয়নে। আমি ২০২১ সাল থেকে ফুসকা বিক্রি করছি। তবে, দেড় মাস আগে গত রমজানের ঈদের পর থেকে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। প্রতিদিন ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকার ফুসকা, ঝালমুড়ি, চিপস বিক্রি করছেন তিনি।
এ বিষয়ে শিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, গত কয়েক আগে চায়নারা সেখানে বালু দিয়ে ভরাট করে কিছু জমি সেল (বিক্রি) করছে। আবার কিছু জমিতে ফ্যাক্টরি নির্মাণ করবে।
শিবপুরের বাসিন্দা ও ভোলা সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ ইউনুস বলেন, এই তীব্র গরমের মধ্যে ভোলায় আসলে একটু ঘোরার মতো তেমন কোন জায়গা নেই। তাই চায়না কোম্পানির ক্রয় করা ওই জমির একপাশে মেঘনা নদীর ঢেউ আরেক পাশে বালুর মাঠ। মাঠের মধ্যে আবার কিছু সারি সারি খেজুর গাছ। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছে এখানে। ফলে এটি এখন তাদের একটা আকর্ষণীয় স্পট হিসাবে পরিনত হয়েছে। তবে, গত কয়েকদিন ধরে বালুর মাঠে মানুষের যাতায়াতের উপর অনেকটা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরি মো: ঝিলন বলেন, অনেজে এখানে এসে বালুর বস্তা কেটে ফেলে। আবার অনেকে মাদক সেবন করে মাতলামি করছে। তাই, ১ জুন থেকে ভেতরে প্রবেশে নিষেধ করেছে চায়না কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।