দুর্ঘটনা প্রতিরোধী ডিভাইস উদ্ভাবন

ফের জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছে বোরহানউদ্দিনের ক্ষুদে বিজ্ঞানী লাবিব

শিমুল চৌধুরী ॥ এবার দুর্ঘটনা প্রতিরোধী ডিভাইস উদ্ভাবন করে ফের জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছে ক্ষুদে বিজ্ঞানী মাহির আশহাব লাবিব। সে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার আব্দুল জব্বার কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা এএইচএম মোস্তফা কামাল উপজেলার আব্দুল জব্বার কলেজের প্রভাষক। মা ইয়াছমিন একজন গৃহিণী।
লাবিবের বাবা এএইচএম মোস্তফা কামাল জানান, তাঁর ছেলে মাহির আশহাব লাবিবের উদ্ভাবনী নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধী ডিভাইস পাইলট প্রকল্প হিসাবে গ্রহন করেন বিআইডব্লিউটিএ। জেলা পর্যায়ে “ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২” এর ‘সাধারণ- বেসরকারি (শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি)’ ক্যাটাগরীতে উদ্যোগটি চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ায় তথ্য ও যোগাযোগ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার গ্রহনের জন্য পত্র দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত ওই পত্রে সোমবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি)আয়োজিত ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস ২০২২ এর উদ্বোধনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহন করতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে এ পুরস্কার প্রদান করবেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
কলেজছাত্র মাহির আশহাব লাবিব জানান, (Digitalized BIWTA, A Life protective device for passenger vessel) এমন একটি যন্ত্র যা যাত্রীবাহী লঞ্চের ভেতরে প্রবেশ পথ ও বির্গমন পথে লাগানো থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লঞ্চের ভিতরে প্রবেশকারি যাত্রী ও একইসাথে লঞ্চ থেকে বের হওয়া যাত্রীর সংখ্যা আলদা আলাদাভাবে ডিসপ্লেতে দেখাতে থকে। যদি মোট যাত্রী সংখ্যা উক্ত নৌ-যানে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নির্ধারিত সর্বোচ্চ যাত্রী ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশী হয় তবে তা সনাক্ত করে তৎক্ষণাৎ উচ্চশব্দে সাইরেন বাজিয়ে নৌ-যানে অবস্থানরত যাত্রী, নৌ-যানের চালক এবং নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ তথা বিআইডব্লিউটিএ  এর কর্মকর্তাদেরকে সতর্ক করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত যাত্রীধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নৌযানের অভ্যন্তরে থাকবে ততক্ষণ সাইরেন বাজতে থাকবে। যাত্রী সংখ্যা নির্ধারিত মাত্রার নিচে আসলে কেবল তখনই সাইরেন বন্ধ হবে।
নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে এ খুদে বিজ্ঞানী বলেন, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর ওয়েবসাইট থেকে বিগত ৬ বছরে দেশে ঘটে যাওয়া নৌ- দুর্ঘটনাগুলোর তথ্য-উপাত্ত লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০১৬- ২০১৮ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৪২৫টি দুর্ঘটনা ঘটলেও ২০১৯ সালে তা প্রায় দ্বিগুন হয়ে যায়। ২০২০ সালে অর্ধেকে নেমে আসলেও ২০২১ সালে আবার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবনতা দেখা যায়। ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনাগুলোর অনেক কারণ থাকলেও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুল কারণ ছিল ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রীবহন। এই দুর্ঘটনাগুলোতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। অথচ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন ২০১৯ এর ৬৬ ধারায় অতিরিক্ত যাত্রীবহন করাকে বেআইনি ঘোষনা করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিভাইসটির নাম ডিজিটালাইজ বিআইডব্লিউটিএ রাখা হলো কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে এই খুদে বিজ্ঞানী জানান, “মূলত যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ কে ডিজিটালাইজ করাই আমার উদ্দেশ্য”। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূলত ডেকে ভ্রমণকারীসহ অধিকাংশ যাত্রী লঞ্চে উঠার পর টিকিট করে। আবার নিয়ন্ত্রণকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটএ’র জরিপ সনদপত্রে দিনের বেলা যাত্রী পরিবহন ও রাতের বেলা যাত্রী পরিবহনে যাত্রী ধারণ ক্ষমতায় ভিন্নতা থাকে। তাই লঞ্চ যাত্রীদের প্রকৃত সংখ্যা মালিক পক্ষই শুধু জানে। নিয়ন্ত্রণকারি কতৃপক্ষ হলেও বি আই ডব্লিউ টিএ’র কাছে এ বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য থাকে না। যার ফলে যাত্রীবাহি লঞ্চ চলাচললে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রীবহন থেকে লঞ্চ ব্যবসায়ীদেরকে বিরত রাখা প্রায় দুস্কর হয়ে উঠেছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রথমেই নিয়ন্ত্রণকারি সংস্থা আই ডব্লিউ টিএ-কে যুগোপযোগী ও ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই তিনি Digitalized BIWTA, A Life protective device for passenger vessel নামক ডিজিটাল ডিভাইস আবিস্কার করেছেন বলে জানান। লাবিব দৃঢ়তার সাথে বলেন, যদি স্বদিচ্ছা থাকে তবে এ যন্ত্রটির মাধ্যমে কার্যকরভাবে যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোতে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
ডিভাইসটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ডিভাইসটিতে জিপিএস যুক্ত করে ইন্টারন্টে সার্ভার এর সাতে সংযুক্ত করার কাজ চলমান আছে। এরপর বিআইডব্লিউটিএ এর অনুমতি সাপেক্ষে ডিভাইসটিকে বিআইডব্লিউটিএ -এর সার্ভার এর সাথে যুক্ত করে দেওয়া গেলে বিআইডব্লিউটিএ প্রতিটি নৌ-যানের রিয়েল টাইম যাত্রী সংখ্যা তাদের অফিসে বসেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং নৌযানটি অন্য কোন ঘাট থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছে কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। এর ফলে অন্তত এই একটি কারণে নৌ-দুর্ঘটনা কমে আসবে বলেও মনে করেন এ ক্ষুদে বিজ্ঞানী।
এ বিষয়ে বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (অঃ দাঃ) মুন্নী ইসলাম রোববার দুপুরে ভোলার বাণী কে বলেন, ক্ষুদে বিজ্ঞানী লাবিব খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। সে উপজেলা পর্যায়ে প্রত্যেকটা বিজ্ঞান মেলা ও জাতীয় প্রযুক্তি সপ্তাহসহ সকল উদ্ভাবনী মেলায় নতুন নতুন বিষয় নিয়ে উদ্ভাবনগুলো উপস্থাপন করে। যেগুলো জাতীয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। ইউএনও আরও বলেন, মেধাবী ও ক্ষুদে শিক্ষার্থী লাবিব সোমবার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার গ্রহন করবে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে দশম শ্রেণির ছত্র থাকা অবস্থায় ‘স্মার্ট গ্যাস লিকেজ ডিটেক্টর’ নামক ডিভাইস আবিষ্কার করে আইসিটি খাতে অনন্য আবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বেসরকারি সাধারণ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ট ব্যক্তি হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার-২০২১ লাভ করার গৌরব অর্জন করেন এ খুদে বিজ্ঞানী।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।