মধ্যরাত : পর্ব-১০১

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন), 

(গত পর্বের পর) : দোলা বলল দাদু, বাসায় হারমোনিয়াম নেই। গিটার নেই, ছাই একটা বেহালাও যদি থাকত তবে এই চাঁদের আলোয় গানের জলসা বসাতাম। তা তোমার কি চাই বলো ? দাদু আমাকে গিটার কিনে দাও, আমি কচ এর কাছে গিটার শিখব, বেহালা শিখব। আমি বললাম, তুমি কি শেষ পর্যন্ত গিটার ও বেহালার উপর এম এস ডিগ্রী নেবে ? দোলা বেহালা গিটার শিখলে কি এম এস ডিগ্রী নিতে কোন অসুবিধা হবে ? আমি এম এ পাশ করছি। গানের মাষ্টারের কাছে গানও শিখেছি। আমার পাশের কোন ব্যঘাত হয়নি। তুমি গিটার এনে দাও, দেখবে আমি এম এস করে পিএইচডি করে ফেলেছি।
আমি বলালম, আচ্ছা কাল বিকালে চলো ডাউন টাউনে তুমি কচ। চলো আমার সাথে। কচ তুমি বুঝবে যন্ত্র পাতির ব্যাপার। ডুগি, তবলা, একজোড়া কিনে দিতে হবে। তা তোমাকে এসব কে শেখাবে, দোলা বলল কেন ? কচ ? এই বলে দোলা আমার চোখের পরে চোখ রাখল। দোলার সেই চোখ সেদিন ছিল বিশ্বাস, অধিকার দাবী নিয়ে কথা বলার অভিব্যক্তি। আমিও এতদিন সংসার করিনি এক নাতনী এসেছে। দাদুর কাছে তার আবদার গান শেখার বাজনা কিনে দিতে হবে। বললাম তথাস্তু।
সেদিন বিকেলে কচকে বললাম কচ চল গিটার কিনতে হবে। দোলার বায়না। আমরা তিনজনেই ডাউন-টাউনে গেলাম কচ সুন্দর দেখে একটি পছন্দ করে দিল একটা বেহালাও নিল। একজোড়া ডুগী তবলা নিল। গিটার, বেহালা, ডুগী, তবলা এসব কিনে বাড়ী ফিরে এলাম। দোলা হাসি হাসি মুখে গাড়ী থেকে উচ্ছল ঝরণার মত তরতর করে নেমে গেল। কচ ধীর গম্ভীর মুখে দোলার পথ অনুসরণ করল। আমি ঘরে গিয়ে গায়ের শার্ট পেন্ট খুলে একটু আরাম করে বসলাম। দোলাকে বললাম, তোমরা কিছু খাও, দোলা চলে গেল কচকে বৌদিকে খেতে ডাকল। বৌদি বলল, আমি কিছু খাবনা, কচ খেল। দোলাও খেল আমি সামান্য দুধ খেলাম।
আমি ঘরে এসে আমার ঘরে কচ ও দোলাকে ডাকলাম। দোলা এস, দাদুকে গান শোনাও। দোলা বলল, দাদু আমিত গিটার বাজাতে জানিনা। কচকে বলেন। কচ এসে গালিচায় আসন গ্রহণ করে গিটারটা কোলের উপর তুলে নিল। কচ বাজাল।
জীবন যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পার
মোর সমাধির পরে জ্বেলে- দিও,
গানটা গিটারের তারের তালে তালে কচের আঙ্গুলগুলি দ্রুত যেন ছন্দে ছন্দে নেচে নেচে চলছিল। আমি যেন অবাক হয়ে তার হাতের আঙ্গুলগুলির দিকে নির্নিমেষ নয়নে চেয়ে চেয় ভাবলাম। এ-যে সুরের যাদুকর, যাদুর ছোঁয়ায় আমার বুভুক্ষিত অন্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল। আমি যেমন বলতে চাইলাম, ওগো থামাও থামাও। তোমার এ গানের মুর্চ্ছনা। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বারান্দার বেলকুনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে উদার আকাশের বুকে তাকিয়ে আমার বন্ধ করা নিশ্বাস ফেললাম। জানিনা সেদিন ডোরার হৃদয়ে কতটুকু কচ এর প্রধান্য লাভ করেছিল। সেদিন রাত পর্যন্ত কচ আর দোলা অনেক গল্প করল। গল্পের যেন ওদের শেষ নেই। আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম, তখন অনেক রাত। একবার ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম কোন সারাশব্দ নেই, ভাবলাম বুঝি ওরা ঘুমিয়েছে।
কিন্তু মধ্যরাতে বেহালার করুণ সুর আমার কানে এসে একটি আর্তনাদের মত বিধতে লাগল। গান আমারে ভালবেসে, আমারি লাগিয়া সয়েছ কতব্যাথা, বেদনা অপমান, আমার যে মনে হয়েছিল এই মধ্যরাতের আকাশের চাঁদ তারা মাটির পৃথিবীতে একবার নেমে এসেছিল। রাত জাগা মধ্য রাতের নিশাচর পাখি তার প্রহর ঘোষণা করতে ভুলে গিয়েছিল। ভগবানও নাকি মধ্য রাতের সাধনায় সাত আসমানের নীচে নেমে আসেন পৃথিবীর মানুষেরা করা কি মনের বাসনা তার কাছে কামনা করলে তিনি নাকি পূর্ণ করেন।

(চলবে—–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।