মধ্যরাত : পর্ব-৬৯

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : দোলা সামনা মাসনি বক্সে বসেছিল। ভয়ে আতঙ্কে বলল দাদু, আমরা আবার ফিরে যাবত ? আমি বললাম, নারে ভয় করিসনে। সুশান্ত, উমা বোধ হয় কাঠ হয়ে গিয়েছে। কোন কথা বার্তা নেই। আবার ট্রেন নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তারপর আমরা মোটেলে চলে আসার জন্য অস্থির হলাম। সুশান্ত বলল, প্রশান্ত মোটেলে চল। রাত অনেক হল তখন প্রায় সকলেই গাড়ীর নম্বর দেখছে। আমিও নম্বর মিল করে পাড়ি জমালাম। মোটেলে এসে লম্বা ঘুম দিলাম।
তারপর ঠিক করলাম মায়ামি সি-বিচে যাব। দুপুরে লাঞ্চ সেরে রওয়ানা দিলাম। ফ্লোরিডা থেকৈ ৫০ মাইল দূরে এই মায়ামি সি-বিচ। দিগন্ত বিদায়ী মেঘমুক্ত নীল আকাশ আমাদের হাতছানি দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল। পথে যেতে কত সাগর পাখি, কত লাল-নীল-বেগুনি বন ফুল। পথের দু’পাশে ফুটে আমাকে মিঠে মিঠে কথা বলে ভুলিয়ে রেখেছিল। সাগরের গান, তার মুর্ছনা, তার গর্জন আমার দু’কান স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সাগরের শীতল বাতাসে আমার শরীর, মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে আমার লেখা কবিতাটা মনে পড়ল-
আমি যদি মরে যাই, আমার কোন দুঃখ নাই
যদি আমার কবর হয় মহা সমুদ্রের পাড়ে,
দু’বেলা সমুদ্রের জোয়ার এসে
আমার কবর ধুয়ে যায় বারে বারে।
সমুদ্রের কাছে গিয়ে আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম। অনাদি অনন্ত অসীম অফুরন্ত তার বিশাল বিস্তৃতি তার ছল ছল, কল কল শব্দে আমার কোন কথা মুখে আসছেনা। কেউ বললেও কিছু শোনার উপায় নেই। সুশান্ত উমাকে সমুদ্রের সৌন্দর্য্য সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছিল। দোলা সমুদ্রের পাড় থেকে দৌড়ে দৌড়ে ঝিনুক কড়ি শামুক কুড়োচ্ছিল। আমি সমুদ্রের উদ্দামতাকে উচ্ছলতার মাঝে তন্ময় হয়ে ডুবে গিয়েছিলাম। অনেক অনেক দূরে আকাশের সীমা রেখা যেখানে সীমাহীন হয়ে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সেখানকার পারি পার্শিক সৌন্দর্য্য আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমি যেন বিদিশা হয়ে দেখছিলাম আর দেখছিলাম।
দাদু, নামবেনা ? আমি চমকে উঠলাম। তোমরা নামছ ঘুড়ছ, ঘুড়ে ঘুড়ে দেখ। আমি ড্রাইভিং সিটে বসে দেখি। বড় ক্লান্তি লাগছিল, আর অনেক স্মৃতি, বিস্মৃতি, অনেক জানা, অনেক অজানা, মনের ভিরত গুমরে গুমরে ফিরছিল। দোলা উমা সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে কতক্ষণ বসেছিল। দু’জনেরই জীবন আনন্দে আশায় আকাঙ্খায় ভরপুর। সুশান্ত বলল উমা ¯্রােতের সাথে আবার ভেসে যেওনা। ওরা হেসে উঠল ? আমরা কি ছেলে মানুষ। সুশান্ত বলল এ রকম অনেক গল্প আছে। বেড়াতে এসে সমুদ্রে ¯œান করতে এসে সমুদ্রের ¯্রােতে ভেসে গেছে। ওরা বড় বড় চোখ করে আমাদের দিকে চেয়ে দেখছিল। প্রায় দুপুর শেষ হয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। সূর্য্য ডুবু ডুবু করছিল, পূর্ণিমার প্রকান্ড চাঁদ বিশাল বিস্তৃত আকাশের কোনে সোনার থালীর মত হয়ে ভেসে উঠল। সূর্য্য টুপ করে সমুদ্রের বুকে ডুবে গেল। সে কি মনোহর, মনোরম, সে কি অপুর্ব, চোখে না দেখলে কল্পনা করা যায় না।
(চলবে————-)
