সর্বশেষঃ

ভোলায় প্রথমবারের মতো সুপারফুড ‘চিয়া বীজ’ চাষে সফলতার মুখ দেখছেন কৃষক নওয়াব মাঝি

ভোলায় পরীক্ষামূলক ভাবে এই প্রথমবারের মতো চাষ করা হয়েছে চিয়া বীজ। জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার কৃষক নওয়াব মাঝি পুষ্টি ও ঔষধি গুণে ভরা বিদেশী জাতের এ ফসল চাষ করে সফলতার মুখ দেখছেন। তিনি ৮ শতাংশ জমিতে এ বছর চিয়া বীজ চাষ করেছেন। আশানুরূপ ফলনের প্রত্যাশাও করছেন।
তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রামের কৃষক নওয়াব মাঝি বুধবার সকালে ভোলার বাণী’কে জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি এই নতুন ফসল চিয়া বীজ ৮ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন। কৃষি বিভাগ বীজ ও সার সরবরাহ করেছে এবং চাষ পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছে। আমার শুধু খরচ হয়েছে মাত্র ৮০০ টাকা। খরচ বাদে এ ফসল বিক্রি করে ৫-৬ হাজার টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, এর আগে এই ফসল কোনোদিন দেখিনি।
কৃষি বিভাগ থেকে জেনেছি, এই ফসল মানব শরীরের জন্য খুবই উপকারী। বাজারে এই ফসলের মূল্য অনেক বেশি। চিয়া বীজ হলো সুপারফুড। উৎপাদিত চিয়া বীজ আমি নিজে খাব এবং বিক্রিও করব। ভালো ফলন ও বাজার সুবিধা পেলে আগামীতে আরও বেশি জমিতে এই ফসল চাষ করার আশাবাদী এ কৃষক নওয়াব মাঝি। তিনি আরও বলেন, নতুন ও পুষ্টি গুনে ভরপুর বিদেশি এ ফসল চাষে আমার সফলতা দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক চিয়া বীজ চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তারা আগামীতে কৃষি অফিস থেকে বীজ সংগ্রহ করে এ ফসল ফলাবেন। ওই গ্রামের কৃষক আবুল কালাম, আলম ও সুদেশন দাস জানান, তারা আগামীতে কৃষি বিভাগের পরামর্শে চিয়া বীজ চাষ করবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চিয়া বীজ মধ্য আমেরিকার একটি উদ্ভিদ। পুদিনার একটি প্রজাতি। বিভিন্ন পোষক পদার্থের উপস্থিতির জন্য এটিকে সুপারফুড বলা হয়। প্রতি বিঘা জমিতে চিয়া বীজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ১২-১৫ হাজার টাকা। বীজ উৎপাদন হয় ৭০-৮০ কেজি। প্রতি কেজি বীজ বিক্রি হয় ৭০০-১০০০ টাকা দরে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চিয়া বীজ বপন করতে হয়। ফলন ঘরে তোলা যায় মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। চিয়া বীজ উৎপাদনে জৈবসারের ব্যবহার বেশি করতে হয়।
বিভিন্ন গবেষণার সূত্র উল্লেখ করে কৃষি বিভাগ জানায়, শর্করা, ফাইবার, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাসসহ একাধিক খনিজ পদার্থ রয়েছে চিয়া বীজে। এ ছাড়া, একাধিক ভিটামিন ও প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট রয়েছে চিয়া বীজে। রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও। ফলে শরীরে পাচনতন্ত্র ও মেটাবলিজমের জন্য অত্যন্ত উপকারী চিয়া বীজ। চিয়া বীজে ফাইবারের পরিমাণ থাকে অনেক। প্রয়োজনীয় ফাইবার পাওয়া যায় এই বীজ থেকে। ফাইবারের প্রাধান্যের কারণে হজম প্রক্রিয়া ভালো থাকে। চিয়া বীজ পাচন প্রক্রিয়া ঠিক রাখায় কমতে পারে ওজনও। এ ছাড়াও, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে এ ফসলটি। চিয়া বীজ খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের সমস্যা কমে। রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এই বীজ। ফল বা দইয়ের মতো বিভিন্ন ধরনের খাবারের সঙ্গে খেতে হয় এই বীজ। পানিতে ভিজিয়ে রেখেও খাওয়া যায়। শরবতে ব্যবহার করা যায়। লেবুর রসের সঙ্গে বা দুগ্ধজাত পদার্থের সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়া যায়।
তজুমদ্দিন উপজেলার আড়ালিয়া ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিরেন চন্দ্র দে বলেন, গবেষণা করে আমাদের কৃষিমন্ত্রী মহোদয় নতুন আবিস্কারক এ চিয়া বীজ বিদেশ থেকে আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন। সেই ফসল তজুমদ্দিনের একমাত্র কৃষক নওয়াব মাঝি চাষ করেছেন এবং ভালো ফলন হয়েছে। এতে ওই কৃষক লাভবানও হবে বলে আশাবাদী। আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। নওয়াব মাঝির মতো আশেপাশের আরও কৃষক যদি আগামীতে এ চিয়া বীজ উৎপাদন করতে পারে তাহলে কৃষকরা উপকৃত হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভোলা জেলার উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার আড়ালিয়া ব্লকে পরীক্ষামুলক ভাবে প্রথম বারের মতো চাষ করা হলো চিয়া। প্রথম বছরেই সফলতার মুখ দেখলেন তজুমদ্দিনের কৃষক নওয়াব মাঝি। পুষ্টি ও ঔষধি গুনাগুন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশি জাতের এ বীজটি দুধের চেয়ে ৫ গুণ বেশী ক্যালসিয়াম। কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি। পালং শাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশী আয়রন (লোহা)। কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম। স্যামন মাছের থেকে ৮ গুণ বেশী ওমেগা-৩। এক আউন্স (২৮ গ্রাম) চিয়া সিডে আছে; ফাইবার- ১১ গ্রাম, প্রোটিন- ৪ গ্রাম, ফ্যাট- ৯ গ্রাম (যার ৫ গ্রাম আবার Omega-3) ক্যালসিয়াম- RDA (Recommended Dietary Allowance) এর ১৮% ম্যাঙ্গানিজ- RDA এর ৩০% ম্যাগনেসিয়াম- RDA এর ৩০% ফসফরাস- RDA এর ২৭% সমুচিত পরিমাণে জিঙ্ক, ভিটামিন বি৩ (নায়াসিন), পটাশিয়াম, ভিটামিন বি১ (থায়ামিন)ও ভিটামিন বি২ এনার্জি-১৩৭ ক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেড-৩ গ্রাম, জিঙ্ক-১ মিলিগ্রাম, তাম-১ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম-৮ মিলিগ্রাম, ১ গ্লাস পানি/সরবতের সাথে ২ চামচ চিয়া সিডস ও ২ চামচ খাটি মধু। এর চেয়ে বেস্ট কোনো সুপারফুড থাকতে পারে না।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।