সর্বশেষঃ

চরফ্যাশনে সনদ জালিয়াতি করে চাকুরী করেছেন এক প্রধান শিক্ষক ॥ নিয়েছেন সকল সুযোগ-সুবিধা

মজির উদ্দিননামা-১
অভিযোগ গুরুত্বর না হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয় না : কামরুজ্জামান

ভোলার চরফ্যাশনে সনদ জালিয়াতি করে চাকুরী করেছেন এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সদ্য সরকারীকৃত স্কুল থেকে তিনি ২০২১ সালে অবসরে গেছেন। অবসরে যাওয়ার আগেই তার এই স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের উপ-পরিচালক এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর মিরপুর এর মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কোন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় নি। যদি তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হতো তা হলে অবশ্যই এর একটা ফলাফল দেখা যেত। কিন্তু কি কারণে বা কার ইশারায় তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এমন প্রশ্ন এখন সবার মনে ? কিভাবে ওই প্রধান শিক্ষক সনদ জালিয়াতি করে চাকুরী করেছেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুধু সনদ জালিয়াতি নয়, তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার সনদ জালিয়াতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর দুর্নীতির ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে আজ জানুন সনদ জালিয়াতির খবর।
অভিযোগ এবং তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কলেজ পাড়া আনছারিয়া (সদ্য সরকারীকৃত) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ. কে. এম মজির উদ্দিন প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করেছেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সরকার সারাদেশের কয়েক হাজার রেজিষ্ট্রার্ড এবং স্বীকৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে। ওই তালিকার মধ্যে পড়ে এ স্কুলটি। সরকার ১৪/০৭/২০০৮ইং সালে একটি পরিপত্র জারি করে। ওই পরিপত্রে প্রধান শিক্ষকের পদে থাকতে এবং স্কেল পেতে হলে এসএসসি ও এইচএসসি’র যে কোন একটিতে বাধ্যতামূলক দ্বিতীয় বিভাগ এবং পিটিআই পাশ থাকতে হবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এ. কে. এম মজির উদ্দিনের এসএসসি, এইচএসসি’র দুটোতেই তৃতীয় বিভাগ বিদ্যামা। তা হলে প্রশ্ন হল তিনি কিভাবে প্রধান শিক্ষকের পদ ও স্কেল প্রাপ্ত হলেন ?
এদিকে দেখা গেছে সরকারের ওই পরিপত্র জারির পরে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় চরফ্যাশনের স্মারক নং-৪৩২, তারিখ-২০/১০/২০১০ ইং তারিখে ৫৩ জন প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতি ও প্রধান শিক্ষকের পদের স্কেল প্রদানের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। ওই তালিকায় ১৫নং ক্রমিকে কলেজ পাড়া আনছারিয়া (সদ্য সরকারীকৃত) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম মজির উদ্দিনের নামও ছিল। তাই তিনি জাল-জালিয়াতি, ছলচাতুরী ও দুর্নীতির মাধ্যমে এইচএসসি এবং বি.এ’র সনদ তৈরী করেন যা এখন স্পষ্ট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ. কে. এম মজির উদ্দিন তার প্রধান শিক্ষকের পদ টিকিয়ে রাখতে নিয়েছেন ছলচাতুরী, অনিয়ম আর দুর্নীতির আশ্রয়। তিনি ১৯৮৪ সালে তৃতীয় বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন। তার এসএসসিতেও তৃতীয় বিভাগ থাকায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে থাকতে পারছেন না এমন শংকায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) থেকে ২০০৯ সালে ২.৭৮ পেয়ে বি.এ পাশ করেছেন এমন একটি সনদ দাখিল করেন। এবং ২০১০ সালে একই প্রতিষ্ঠান (বাউবি) থেকে ৩.৩৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেন এমন সনদ দাখিল করেন। তা হলে প্রশ্ন হল কেউ যদি ২০০৯ সালে বি.এ পাশ করেন, তিনি কিভাবে আবার ২০১০ সালে এইচএসসি পাশ করেন ? এতেই প্রমাণিত হয় যে তিনি জাল-জালিয়াতি এবং ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন।
আরো জানা যায়, সরকারের ১৪/০৭/২০০৮ সালের পরিপত্রের নীতিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদ বহাল এবং স্কেল পেতে হলে বিভাগীয় অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু তিনি তা না করে ২০০৯ সালে বি.এ পাশের একটি জাল সনদ দাখিল করেন। অনিয়মভাবে বি.এ পাশের বিষয়টি জানাজানি হলে তদস্থলে ২০১০ সালে বাউবি থেকে এইচএসসি পাশের আরো একটি জাল সনদ দাখিল করেন। যেটিও ছিল জাল ও মিথ্যা এবং তৈরীকৃত। উক্ত এইচএসসি পাশের সনদে কোথাও প্রার্থীর রেজিষ্ট্রেশন, রোল নং, কেন্দ্র কোন কিছুই উল্লেখ নেই। এছাড়া ওই প্রধান শিক্ষকের মাতার প্রকৃত নাম আনোয়ারা বেগম। কিন্তু ওই এইচএসসি সার্টিফিকিটে লিখা হয়েছে আমিনা বেগম। এখানেও প্রমাণিত হয় যে উক্ত সার্টিফিকেটটি জাল, ভূয়া এবং তৈরীকৃত।
অন্যদিকে একজন শিক্ষার্থীকে একটি সনদের পর অপর একটি সনদ পেতে হলে অবশ্যই সময় মেনটেন করতে হবে। কিন্তু এ. কে. এম মজির উদ্দিন তার সম্পূর্ণ উল্টো ও ব্যতিক্রম। তিনি ২০০৯ সালে করেছেন বি.এ পাশ। আর ২০১০ সালে করেছেন এইচএসসি পাশ। যা খুবই অদ্ভুত, বেমানান ও নিয়ম বর্হিঃভূত। তা হলে কিভাবে তিনি এ কাজ করেছেন ?
আরো জানা গেছে, তিনি এই সনদ জালের মাধ্যমে সকল প্রকার আর্থিক সুবিধাদি গ্রহণ করে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে অবসর গ্রহণ করেছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তার এই কাজের পিছনে তাকে কে বা করা সহযোগিতা করেছেন এ প্রশ্ন থেকেইে যাচ্ছে ? তার এই সনদ জালের বিষয়টি কি কর্তৃপক্ষ দেখেননি ? না দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন। কর্তৃপক্ষ কেন না দেখার ভান করে থাকবেন এটা বোধগম্য নয় ? এখানে সনদ যে জাল এবং তৈরীকৃত তা স্পষ্ট প্রতিয়মান। কিভাবে এত বড় অনিয়ম আর দুর্নীতিকে তারা প্রশ্রয় দিয়েছেন তারা ? তা হলে কি তারা বড় কোন অংক খেয়ে কিংবা উপর মহলের কোন ইশারায় চুপ থেকেছেন ?
এদিকে এ শিক্ষক যে সি.ইন.এড পাশের সনদ দিয়েছেন তাতে সিরিয়াল নাম্বার থাকলেও কোন ক্রমিক নম্বর নেই। এছাড়া তার ইংরেজী নামটি ওভার রাইটিং ও ঘসামাজা করা। এবং বাংলা ও ইংরেজী নাম দুইটি একই ব্যক্তির হাতের লেখা বলে মনে হচ্ছে। এতে প্রতিয়মান হয় যে তিনি যে সি.ইন.এড পাশের সনদ দাখিল করেছেন সেটাও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে করেছেন। তা হলে এখন প্রশ্ন হল যিনি এই জাল-জালিয়াতি করেছেন এবং যারা তার এ অপকর্মকে সমর্থন করেছেন তারাও কোনভাবে এ দায় এড়াতে পারবেন না। সকলকেই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন সচেতন মহল। সু-প্রিয় পাঠক আজ জানলেন প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম মজির উদ্দিনের জাল সনদের কাহিনী। আগামী সংখ্যায় পড়–ন এক কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতির খবর। জানতে চোখ রাখুন আমাদের সাথেই।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম মজির উদ্দিনের সাথে কথা বললে তিনি তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং যারা এ অভিযোগগুলো দিয়েছেন তাদেরকেও দেখে নেয়ার হুমকি প্রদান করেন।
প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম মজির উদ্দিনের সার্টিফিকেট জাল করার বিষয়টি নিয়ে কথা হয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ওয়াহিদুল ইসলামের সাথে। এ সমস্ত অভিযোগের বিষয়য়ে তার ব্যবহৃত ০১৭১৫—০০৬ মোবাইল নাম্বারে কথা বলে তিনি বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে শুনেছি প্রধান শিক্ষক এ. কে. এম মজির উদ্দিনে বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সেগুলোর তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন ভোলার শিক্ষা অফিসার মোঃ কামরুজ্জামান স্যার। স্যার তদন্ত করে গেছেন, তিনিই ভাল বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা অফিসার মোঃ কামরুজ্জামান ব্যবহৃত ০১৭১৬—৩৯০ মোবাইল নাম্বারে কথা হলে তিনি জানান, আমি যখন তদন্ত করেছি তখন জাল সনদের বিষয়টি ছিল না। ছিল স্কুলের জমি সংক্রান্ত ও আর্থিক কিছু বিষয়। আরো ৩ মাস আগে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেগুলো এখন কোথায় আছে তা আমি বলতে পারছি না। জাল সনদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তার (এ. কে. এম মজির উদ্দিন) এর সনদ অনলাইনে সার্চ করা হলে পাওয়া যায়, তা হলে কিভাবে আমরা এটা জাল বলবো। এ. কে. এম মজির উদ্দিনের সকল কাগজ পত্র জেলা শিক্ষা অফিসে আছে, আপনারা সেখানে গিয়ে সেগুলো দেখতে পারেন। যদি সনদপত্র জাল হয় তা হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সনদ যদি জাল হয় তা হলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ-ই আইনের উর্ধ্বে নয়। এছাড়া তিনি আরো বলেন, যদি কোন শিক্ষক অবসরে চলে যান তখন তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠে, তখন সেটা যদি গুরুত্বর না হয় তা হলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তখন তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করতে হয়।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।