নিষিদ্ধ জাটকায় সয়লাব ভোলার বাজার, চলছে ঢিলেঢালা অভিযান

নিষিদ্ধ জাটকায় সয়লাব হয়ে গেছে উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলার হাটবাজার। গত কয়েক দিন ধরে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে এখন জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা ইলিশ। ফলে ইলিশের অভয়ারন্যসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার সব মাছ বাজার এবং পাড়া-মহল্লায়ও ফেরি করে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে জাটকা। আগের চেয়ে দাম কমেছে কেজিতে কমপক্ষে ১০০ টাকা। গত কয়েক দিন থেকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে জাটকা নিধনের রমরমা বাণিজ্যের বিষয়টি এখন চোখে পড়ার মতো। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযানের নামে কিছু জাটকা আটক করে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশসহ মৎস্য বিভাগ। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে জাটকা ধরছে ও বিক্রি করছেন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে এখন জাটকা সংরক্ষণের সময় চলছে। ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা (১০ ইঞ্চির ছোট ইলিশ) ধরা বা আহরণ ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। প্রশ্ন ওঠে, বাজারে এত জাটকা আসছে কোত্থেকে ? এই জাটকা কারা ধরছে ? কেন ধরছে ? গত কয়েক দিন ধরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কতিপয় জেলে অবৈধ কারেন্ট জাল ও বিন্দি জাল ফেলে নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ছোট ছোট পোনা ধরছে। ফলে ইলিশ ও বিভিন্ন মাছের প্রজনন ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু মৎস্য বিভাগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেই প্রভাবশালীদের ধরছে না। নাম মাত্র অভিযানে কিছু জাটকা ইলিশ ও জাল জব্দ করলেও অভিযান জোরদার না হওয়ায় এ নিষেধাজ্ঞা তেমন কার্যকর হচ্ছে না।
জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বেশ কয়েক দিন ধরে ভোলার হাটবাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি জাটকার আমদানি হতে শুরু করে। খুচরা বিক্রেতারা এক হালী জাটকা বিক্রি করছেন ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়।
সদর উপজেলার কিচেন মার্কেটের মাছ বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা জাটকা বিক্রি করছেন। খুচরা মাছ বিক্রেতা আলমগীর জানান, আগে জাটকার হালী বিক্রি হতো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। আর এখন এক হালী জাটকা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, ভোলার নদীগুলোতে জেলেরা প্রকাশ্যে জাটকা নিধন করে আসছেন। সকাল ৯টার মধ্যে ভোলার মাছ ঘাটে জাটকাবোঝাই ট্রলার আসে এবং আড়তঘরগুলোতে পাইকারি ডাকে জাটকা বিক্রি হয়। এ কারণে আড়তগুলোতে জাটকার পাইকারি দাম কমে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ভোলায় প্রতিদিন হাজার হাজার মণ নিষিদ্ধ জাটকা ধরা হয় বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ওই নিষিদ্ধ জাটকায় স্থানীয় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। জেলে, মৎস্য আড়তদার, মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলে সমিতির নেতৃবৃন্দ নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ ধরার কথা স্বীকার করেন।

সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী মেঘনা নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে শতাধিক জেলে নদী থেকে বিভিন্ন মাছ ধরে এনেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই জাটকা ইলিশ (ছোট ইলিশ)। এ বিষয়ে স্থানীয় চায়ের দোকানী জাহাঙ্গীর মাঝি বলেন, আমি আগে নদীতে জাল বাইতাম। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে কিছু জেলে অবৈধ কারেন্ট জাল ও বিন্দি জাল দিয়ে নদীর ছোট ইলিশসহ ছোট ছোট মাছগুলো মেরে ফেললেও প্রশাসন তাদেরকে কিচ্ছু বলেনা। অথচ আমাদের মতো দরিদ্র জেলেরা সেসব জাল ফেললে প্রশাসন আটক করে এবং জরিমানা আদায় করেন। আর সরকার আমাদের যে সহায়তা দিচ্ছেন তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। বিষয়টি আমি জেলা প্রশাসককেও জানিয়েছি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তাই, নদীতে জাল ফেলা বন্ধ করে এখন চায়ের দোকান করছি। এমন অভিযোগ জাহাঙ্গীর মাঝির মতো অনেক জেলের।
অভিযোগ রয়েছে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের ভোলার খাল নামক এলাকার প্রভাবশালী আড়তদার সিরাজুল ইসলাম ও তুলাতলী মাছ ঘাটের আড়তদার মঞ্জুর ছত্রছায়ায় কিছু জেলেরা নদীতে অবৈধ বেহুন্দি ও কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন জাল ফেলে নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ ও বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট মাছগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে। তবে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ভোলার খাল এলাকার মাছের আড়তদার সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা জেলেদেরকে জাটকা ধরতে উৎসাহিত করছি না। বরং জেলেরা নিজেরাই জাটকা ধরছেন।
ভোলা জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি এরশাদ বলেন, ভোলার নদ-নদীতে প্রতিদিন কয়েক লাখ পিছ অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মন জাটকা ইলিশ ধরা পড়ছে। এসব জাটকা ভোলা জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাজারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে।
ভোলায় সম্প্রতি জেলেদের জালে জাটকা ধরা পড়ার কথা স্বীকার করে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম আজহারুল ইসলাম মঙ্গলবার ভোলার বাণী’কে বলেন, জাটকাও ধরা হচ্ছে। আবার জেলার ৭ উপজেলায় আমাদের অভিযানও চলছে। তিনি জানান, চরফ্যাশন উপজেলায় সিনিয়র উপজেলা মৎস্য দপ্তর এবং দুলারহাট থানা পুলিশের সহায়তায় গত রাত সোয়া ১২ থেকে তেতুলিয়া নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে ২১টি বেহুন্দি জাল জব্দ এবং পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়। অভিযান চলে ভোর পর্যন্ত। এ ছাড়াও সহকারী কমিশনার ভূমি বিভিন্ন স্পটে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০ মন জাটকা আটক করেন এবং তা বিভিন্ন মাদ্রাসা এবং দুস্থদের মাঝে বিতরন করেন।
তিনি আরও জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলার সাত উপজেলায় ৮৫টি বিশেষ কম্বিং অপারেশ চালানো হয়েছে। এতে ২৩টি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ৩৮৮টি অবৈধ বেহুন্দি জাল, ২ লক্ষ ১৫ হাজার মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল, ৪৭টি মশারী জাল, ১০১টি চরঘেরা জাল, ৮টি জগতবেড় জাল ও ২টি ধরা জাল জব্দ করা হয়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ উপজেলায় বিশেষ কম্বিং অপারেশনে ৪.৭৫ মেট্রিক টন জাটকা জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৮টি বেহুন্দি জাল, ১ লক্ষ ৩৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ৭৯ অন্যান্য জাল জব্দ করা হয়। মামলা দায়ের করা হয়েছে ৩টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২২ হাজার টাকা। এসব অভিযানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। নদীতে অবৈধ জাল ও জাটকা রোধে মৎস্য বিভাগের বিশেষ কম্বিং অপারেশন চলবে বলেও জানান এ মৎস্য কর্মকর্তা।
