মধ্যরাত : পর্ব-৩৩

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : লোভে আমার কথা আড়ষ্ট হয়ে আসছিল। তবুও সুশান্তকে ডাকলুম, ও আমার অতিথি। সুশান্ত এল, তবে ¯œান না করে এল। উমা বলল, ও মা, না ধুয়েই এসেছ ? সুশান্ত বলল, গা ধুয়ে সকালের নাশতা খেতে হবে, রামায়ন মহাভারতে এরকম বেদবাক্য আছে নাকি ? আমরা সকলেই হেসে উঠলাম। যাক সকলেই রুচি সহকারে খেতে লাগলাম। সুশান্ত বলল, একাজ কর, খালি খাওয়া আর শোওয়া। আর গাল-গল্প এসব ভাল লাগে না। চলনা থিয়েটার দেখতে যাই। সকলেই উৎসাহ প্রকাশ করল। আমি কনকোরডিয়া খোজ নিয়ে জানলাম শরৎচন্দ্রের বড়দিদি হচ্ছে। বললাম বইটা খুব ভাল, অমর কথা শিল্পি শরৎচন্দ্র।
বহুদিন বাংলা সিনেমা দেখিন। প্রথম শোর জন্য টিকেট কাটলাম আমাদের চার জনের। ৬টায় বই হবে। ৪টায় বাসা থেকে রওয়ানা দিলাম। খুব বরফ পড়ছিল। চারদিকে খুব অন্ধকার, এ অন্ধকার আমার কোনদিন ভাল লাগেনা। খুব আস্তে আস্তে ড্রাইভ করছিলাম। আর পাশের সিটে সুশান্তর সঙ্গে গল্প করছিলাম। সুশান্ত বলল, ডোকে বললাম থিয়েটার দেখব, আর তুই টিকেট কেটে আনলি বড়দি। প্রশান্ত ডোর কি খুব শরৎচন্দ্রের বই এর প্রতি ঝোক ? আমি বললাম, শরৎচন্দ্রের কয়েকটা বই আমার খুবই প্রিয়। আমরা হলে এসে গেছি। বাংলা বই বলে সমস্ত বাঙ্গালীরা ভেঙ্গে পরেছে হলে। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত সকলেই সকলকে দেখে খুব খুশী। আমার কয়েকজন বন্ধু দল বল নিয়ে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে চাওয়া-চাওয়ি করছে। তখন বই আরম্ভ হয়ে গেছে। হল অন্ধকার, কোন রকমে ঢুকেই বসে পড়লাম।
আমি অনিমেষ নয়নে চেয়ে রইলাম। ত্যাগ তিতিক্ষার এক মহামন্ত্র, এ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বিধবা বড়দি মাষ্টার মশায়কে দুর থেকে খোঁজ খবর নেয়। খাওয়া-দাওয়ার জন্য ঠাকুরকে হুকুম করেন। মাষ্টার মশায়ের আদর-যতেœর যেন ত্রটি না হয়। কিন্তু মনের অজান্তে কখন কোন সময় জানি অধিক ¯েœহ করে ফেলেছেন। ভাল জেনে ফেলেছেন, বুঝি ভালবেসে ফেলেছেন। বড়দি বিধবা। ভালবাসা যে পাপ, মহাপাপ। মাষ্টার মশায় খুব খেয়ালী। বড়দি মনে মনে ভাবেন ছেলেটি বোধ হয় খুব ভালো ঘরের ছেলে। খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই। চশমা কোথায় থাকে তার ঠিক নেই, কে এসব দেখে রাখে ? একদিন বড়দি রাগ করলেন, অন্দর মহলের চাকরদের বলে দিলেন, মাষ্টার মশায়কে বলে দিস, এরকম করলে চলবেনা। ওরকম বেখেয়ালের মত চললে তাকে চলে যেতে বলিস।
চাকর বাকরেরা রবিঠাকুরের একটি কবিতায় আছে না ? বাবু যত বলে, পরিষদ দলে, বলে তার শত গুণ। মাষ্টার মশায় একদিন ভোরে কাকে কিছু না বলে চলে গেলেন। শেষ পর্যন্ত বইটা যদিও কমেডি, তবুও নিশ্বাস বন্ধ করে যেন আমি দেখছিলাম। বড়দি’র কত কষ্ট হচ্ছিল, মষ্টার মশায় চলে গেল বলে। বিধবার যে ভালবাসা ও প্রকাশ করা পাপ, ভাললাগাও প্রকাশ করা অন্যায়। ¯েœহ লাগা ? তাও বলতে পারবে না। লোকে তাকে সন্দেহ করবে। যুগে যুগে এমনি করে কত ভালবাসা আত্মহত্যা করেছে, কত ভালবাসা গৃহত্যাগী হয়েছে, কত ভালবাসা নিরব নিথর নিস্তব্ধ হয়ে কালের গর্ভে নিরন্তন প্রেমিকের মত পাগল হয়ে ছুটো ছুটি করছে।
(চলবে———–)
