মধ্যরাত : পর্ব-৩১

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : ১৯৭০ এর ১২ই নভেম্বরের রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপ-কূলবর্তী জেলাসমূহের উপর দিয়ে যে সামুদ্রিক ঝড় ও প্লাবনের মহাপ্রলয় ঘটে গিয়েছিল। লাখ লাখ লোকের মৃত দেহ মরে পঁচে ফুলে ফেপে গলিত হচ্ছিল। তখন আমিও দেশে গিয়েছিলাম। দেখলাম নদী দিয়ে কত লাশ ভেসে যাচ্ছে। মা মাঝখানে, পাশে ছেলে-মেয়ের গলায় দড়ি দিয়ে বাঁধা। ভেসে যাচ্ছে ভাই-বোন পায়ে শিকল দিয়ে বাঁধা। মানুষের ঘর-বাড়ী ভেঙ্গে চুরে শেষ হয়ে গেছে। মানুষ পাগল হয়ে গেছে পুত্রহারা, কন্যা হারা, স্ত্রী-স্বামী হারা, ভাই-বোন হারা, বোন হারা ভাই। খালের পাড় দিয়ে আকুল আবেগে ডেকে ডেকে বেড়াচ্ছে। নদীর ¯্রােতের মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছে মা তার সন্তানকে। সেকি ব্যকুলিত মায়ের প্রাণ কাড়া আহ্বান।
এই বরিশালকে একদিন বলা হতো- বাংলার শস্য ভান্ডার। এই তিন বারের জল প্লাবনে, উত্তরাত্তর ঝড় এ যে রাশি রাশি মাইল ব্যাপী সুপারী গাছ ও নারকেল গাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। আগে যখন ষ্টীমারে দেশে গেছি, ষ্টীমার নদীর পাড় দিয়ে যাচ্ছে ত যাচ্ছেই। সুপারির বাগান যেন ছবির মত। তার হাজার হাজার মাইল ব্যাপী দিগ-দিগন্ত জুড়ে নদীর পাড় জুড়ে জাকিয়ে ছিল। আজ সেই ষ্টীমারের জায়গায় এখন বড় বড় লঞ্চই বেশী। কিন্তু সে সুপারীর বাগান আর দেখি না। সামুদ্রিক ঝড় ও প্লাবনের পর দেখা গেল জল-জ্যান্ত সুপারি গাছগুলি শুকিয়ে শুকিয়ে মরে গেল। এই বরিশাল জেলার ব্যাপক ক্ষতি হল।
সুশান্ত বলল, থাক দেশের ক্ষতির কথা আর শুনতে ভাল লাগে না। দেশের কিচু সু-খবর থাকলে বল। হ্যাঁ, তবে এখন অনেক স্কুল, কলেজ, গভর্ণমেন্ট কলেজ হয়েছে। হাজার হাজার, লাখো লাখে ছেলে বেরুচ্ছে বি.এ, এম.এ, পাশ করে। কিন্তু বেকার সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। মেয়েরা আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত হচ্ছে। নিজে দু’পয়সা রোজগার করছে। নিজে নিজের অধিকার আদায় করে নিচ্ছে। এখন কিছু লোকের হাতে বেশ পয়সা আছে, কতগুলো নতুন গার্মেন্টস হয়েছে। তাতে কিছু সংখ্যক মেয়েরা চাকুরী পাচ্ছে। কাজে যে লজ্জা নেই, আজ এ জিনিসটা সকলেই বুঝতে পারছে। এটাও দেশের পক্ষে মঙ্গলের কথা।
দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে এল। মেয়েরা উঠে চলে গেল। দুপুরের খাওয়া দাওয়া বেশ ভাল হলো। একটু সকলেই গড়িয়ে নিলাম। আমি বললাম, সুশান্ত, চল শ্যামবেলী ও রুসলী থেকে একটু ঘরে আসি। উমা তখন একটা রক্তলাল জামদানী পড়েছিল। গলায় একটি লাল পাথরের মালা। ডোরা একটি বাসন্তি রংয়ের শাড়ী ও বাসন্তি রংয়ের ব্লাউজ পড়ে গলায় একখানা সোনার চিক পড়েছিল। সত্যি মেয়েরা কিন্তু খুব সাজতে জানে। ওদের সাজার জন্য পৃথিবীতে মেক-আপের জিনিস পত্র বেড়িয়েছে। ফ্রেঞ্চদের আদী অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবন-যাত্রা থেকে খাওয়া, পড়া, লেখা-পড়া, ঔষধ, চিকিৎসা, যুদ্ধ সবই ষ্ট্যাচু করে রেখেছে। তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সেন্টলরেন্স নদী। বিরাট বিস্তৃর্ণ আকাশ মেলা খোলা মাঠ। গরমের সময় বোধ হয় এখানে খুব ভালো পিকনিক করা যায়। জয়গাটা খুবই উপভোগ করার মত, কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন বরফ পড়ছে।
আসলাম রুসলী নায়াগ্রার মত মনে হয়। নায়াগ্রার কিছুরূপ এখানে দেখা যায়। এখানে নাকি বড় বড় রুই মাছ আর অন্যান্য ভাল ভাল মাছ পাওয়া যায়। বরফের জন্য কিন্তু সুন্দরের কিছু অনুভব করা যায় না। উমা বলল, প্রশান্ত দা চলুন না এবার সামারে আমরা মিয়ামি ডিজনী ওয়ালর্ডে যাই। ডোরা বলল, আমিত একবার বেড়িয়ে এসেছি। উমা বলল, তা হবে না ডোরাদি, আপনাকে ছাড়ছি না। আপনাকেও যেতে হবে। ডোরা বলল, দেখি যদি বেঁচে থাকি চিন্তা করব। আমি চুপ করে ছিলাম। সুশান্ত বলল, ডিজনী ওয়ালর্ড নাকি খুবই দেখার জিনিস আছে। চলনা প্রশান্ত, একবার হৈ-চৈ করা যাক। বললাম দেখি।
(চলবে———–)
