ইউপি নির্বাচন, বোরহানউদ্দিনে সহিংসতা বাড়ছে

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দল বিএনপি এবারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তাই চতুর্থ ধাপে উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলার বোরহানউদ্দিনে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে এ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে অধিকাংশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে ভোটের দিন যত দিন ঘনিয়ে আসছে ততই যেন এ উপজেলায় সহিংসতা বাড়ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলছে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ। বিশেষ করে উপজেলার পক্ষিয়া ও দেউলা ইউনিয়নে একাধিক হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভোটের পরিবেশ। এ দুই উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় চেয়ারম্যান প্রার্থীরাও আহত হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের দাবি জানালেও যেন থামছে না সহিংসতা।
গতকাল শনিবার সকালে উপজেলার পক্ষিয়া ইউনিয়নের চশমা প্রতীকের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ সভাপতি মো. আলাউদ্দিন সরদারের বাড়ির সামনে তার উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাঁকে গুরুতর আহত করেছে বলে স্থানীয়রা জানান। এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে পক্ষিয়া ইউনিয়নের চশমা প্রতীকের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ সভাপতি মো. আলাউদ্দিন সরদার কাফনের কাপড় পরে প্রতীক আনতে যাওয়ার পথে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের হামলার শিকার হয়েছেন। এতে তার প্রায় ১০ জন কর্মী ও সমর্থক আহত হয়েছেন। ওই সময়ে তাদের ৮টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়েছে বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলাউদ্দিন সরদার। তিনি জানান, মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. নাগর হাওলাদারের কর্মী ও সমর্থনকারীরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। এ জন্য তিনি প্রতীক বরাদ্দের দিন কাফনের কাপড় পরে প্রতীক আনতে উপজেলা নির্বাচন অফিসে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে তার সর্মথনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা চালিয়ে তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার পক্ষিয়া ইউনিয়নের আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কাঞ্চন মাঝি ও তার কর্মী-সমর্থকদের উপর ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কাঞ্চন মাঝি। তিনি অভিযোগ করে জানান, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় পক্ষিয়া ইউনিয়নের বোরহানগঞ্জ বাজারে জনসংযোগ করতে যান। এ সময় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়। হামলায় তিনিসহ তার শতাধিক কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন বলে দাবি তাঁর। আহতদের বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. নাগর হাওলাদার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার কর্মী সমর্থনকারী জড়িত নয়।
এদিকে পক্ষিয়া ইউনিয়নে সহিংসতা বাড়ায় প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ওই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ফুটবল প্রতীকের মেম্বার প্রার্থী হুমায়ুন কবির, ওই এলাকার ভোটার রত্তন মাঝি, শাহে আলম, আকতার হোসেন, আলাউদ্দিনসহ সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীরা জানান, পক্ষিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হামলা-সংঘর্ষে তারা আতঙ্কিত। আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারা। তারা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া গত ৮ ডিসেম্বর বুধবার সকালে উপজেলার ৩ নং দেউলা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী এ্যাডভোকেট এ কে এম আসাদুজ্জামান বাবুলের কর্মী ও সমর্থকদের ওপর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আসাদুজ্জামান বাবুল। এতে তিনিসহ তার ২৫ কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। এ্যাডভোকেট এ কে এম আসাদুজ্জামান বাবুল জানান, তার সমর্থক ও কর্মীরা লিফলেট নিয়ে ওই দিন বেলা ১১টার সময় তালুকদার বাড়ীর দরজায় গেলে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহাজাদা তালুকদারের কর্মীরা তার কর্মীদের ওপর দেশীও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। হামলায় আহত তাঁর প্রায় ২৫ কর্মী আহত হয়ে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করে জানান, তিনি ও তাঁর কর্মীরা মজম বাজার লিফলেট বিতরণ করার সময় তাদের কর্মীদের সাথে নৌকা প্রতীক সর্মথকরা মুখোমুখি হলে তিনি একপর্যায়ে তাঁর কর্মীদেরকে নিয়ে শান্তিরহাটের দিকে চলে যান। নৌকা প্রতীক প্রার্থী শাহাজাদা তালুকদার বহিরাগতদের নিয়ে তাঁর প্রচার প্রচারণায় বাধা প্রদান করে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এ প্রার্থী।
তবে, অভিযোগ অস্বীকার করে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহাজাদা তালুকদার জানান, আসাদুজ্জামান বাবুলের কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলার সাথে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা জড়িত নয়। তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, আসাদুজ্জামান বাবুল আমাকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে।
এদিকে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় টবগী ইউনিয়নের হাকিম উদ্দিন বাজারের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জসিম উদ্দিন হাওলাদারের নির্বাচনী অফিসে হামলা চালিয়ে অফিসের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জসিমউদদীন হাওলাদার। তিনি বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় বোরহানউদ্দিন উপজেলা থেকে ছাত্র লীগের লোকজন এসে হাকিম উদ্দিন নতুন বাজার এলাকায় আমার নির্বাচনী অফিসে হামলা ও ভাঙচুর করে। এতে ৫-৭ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছে। এ বিষয়ে বির্বাচন অফিসে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান এ প্রার্থী।
এসব বিষয়ে বোরহানউদ্দিন নির্বাচন অফিসার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শহীদুল্লাহ গতকাল শনিবার দুপুরে ভোলার বাণীকে জানান, প্রার্থীদের অভিযোগ পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যেই পক্ষিয়া ইউনিয়ন ও টবগী ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারন দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এবং পুলিশকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
নির্বাচন অফিসারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বোরহানউদ্দিন থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন ফকির ভোলার বাণীকে জানান, প্রার্থী ও ভোটাররা যাতে আইনগত সহায়তা পান সেভাবে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।
