শতাব্দীর মহানায়ক অনন্য মুজিব : শেষ পর্ব

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : আর একটি কথা আমার কাছে বার বার মনে পড়ে, সেদিন বঙ্গবন্ধু তার বাসায় ঘরভর্তি লোকের মাঝে আমাকে কম্যান্ডার ইন চীফ বাংলাদেশ বলে ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুকে তখন একটি কথাই বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু আমি বৃদ্ধা বলে আপনি আপনার মুখে আমাকে এত বড় সম্মান দিলেন। আমি জোয়ান থাকলে হয়তো আমাকে এত বড় সম্মান দিতেন না। বঙ্গবন্ধু হো হো করে হেঁসে উঠলেন। বঙ্গবন্ধুর মনের সরলতা-সহজতা সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
সেদিন আমি ভাবিনি বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবী থেকে বাংলার নরাধম মানুষরা সরিয়ে দিবে। খুনী মানুষরা খুন করে, তার আদর্শ শালীনতায় ভরা, নিরাহঙ্কার ভর, আভিজাত্যে ভরা, আদর্শের শিরোপা থেকে। বঙ্গবন্ধু চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের কোথাও যেন একটা ছন্দপতন হয়েছে আমার। অন্তরের কোমল প্রদেশে প্রচন্ড এক আঘাত খেলাম। লোকে বলে রাজনীতি, হত্যার রাজনীতি। তাহলে সে রাজনীতি আমার জন্য নয়। আমি একজন সামান্য লেখিকা। লেখা হৃদয়ের একটি কোমল স্থান থেকে বের হয়, সে স্থানটি বড় চন্দনচর্চিত, হাজার গোলাপের সুন্দর মহিমায় মন্ডিত। সেখানে হিংসা দ্বেষ কার্পণ্য ও মলিনতা নেই। পাদ পদ্মের বিভূষিত একটি হীরক খনি।
সেখানে বঙ্গবন্ধুর এই হত্যাকান্ডকে জনসাধারণ কিছুতে মেনে নিতে পারে না। আমার নিভৃত বুকের গহীন অরন্যের, নিস্তব্ধ স্পন্দনে, রক্তের শিরায়, আকুল কান্না করে যেন বলছে, বঙ্গবন্ধু তুমি কোথায় ? বঙ্গবন্ধু তুমি কোথায় ? যখন একা বসে থাকি হঠাৎ করে মনে হয় বঙ্গবন্ধু আমাকে বলছেন তো আপনারা ভুলে যাননি। বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন ও ভাল জানতেন। অনেক অনেক অনুষ্ঠানে আমি দূরে দাঁড়িয়ে থাকলে আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে আসতেন।
বঙ্গবন্ধুর বাসায় প্রায়ই যেতাম, তবে ছেলে-মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠতা লাভ করতে পারিনি। হাসিনার কথা বলতে গেলে লিখতে হয়। লোভ লালসা বর্জিত চন্দন চর্চিত শেখ মুজিবের সুযোগ্য কন্যা। তার ছেলে জয় হবার পর আমি একটি সামান্য উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম, হাসিনা তা ফিরিয়ে দিয়ে আমাকে বলেছিল, দোয়া করবেন। এই তার সাথে আমার দু’টো কথা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এল তখন আমি বিদেশে অবস্থান করেছিলাম। শুনেছি আমার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ঢাকা মহানগরীর লোক নাকি শেখ হাসিনাকে একবার দেখার জন্য ভেঙ্গে পড়েছিল। তিনি যখন যেখানে গিয়েছেন লাখো লাখো লোকের সমাবেশ হয়েছে। আমার এক আত্মীয় বলল, ভোলা মহকুমার কথা। তখনও ভোলা মহকুমা জেলাতে পরিবর্তন হয়নি। হাসিনা গিয়েছিল ভোলাতে এত লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়েছিল যে, হাসিনাকে দেখার জন্য ভোলার লোক তখন পর্যন্তও জানত না যে ভোলায় এত লক্ষ লক্ষ লোক আছে। ভাবতে বিস্ময় লাগে।
ভাবতে বিস্ময় লাগে বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্রকারীরা পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েও তার ইমেজকে নষ্ট করতে পারেনি। শেখ মুজিবের কন্যা হাসিনার মাঝে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে সফল করে তুলতে চাই। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করে সুষ্ঠু বিচার করা হউক। তাঁর দৃঢ় মনোভাব নিয়ে দেশ শাসন করুক, আওয়ামীলীগ এগিয়ে যাক, একলা চলার নীতি হাসিনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ তারা এদেশ স্বাধীন করেছেন এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং করতেও পারবেন।
অনেকে তা বিশ্বাস করেন। হয়ত সময় নেবে, কিন্তু আওয়ামীলীগই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র আশার আলো। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীল আন্দোলন বঙ্গবন্ধু যেমনি নির্ভীক, নি:স্বার্থ নেতৃত্ব দিয়েছেন। মানুষ হাসিনার মাঝেও একই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দেখতে চায়। ভবিষ্যত বলে দেবে শেখ হাসিনা পিতার অপূর্ণ সুখী-সমৃদ্ধ-প্রগতিশীল সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না ? শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধি, বন্দর নায়ক, গোন্ডামায়ার, মার্গারেট থেচারের মত একজন নেত্রী কি বাংলাদেশে আসতে পাওে না ? জাতির এক মহাক্রান্তি লগ্নে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় জীবনের একান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অনেক হ্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে একাত্তরে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তার সুফল আজও তো সাধারণ মানুষের জীবনে আসতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীদের কারসাজিতে। দ্বিধাহীন বাক্যে একথা সকলেই স্বীকার করে। একানব্বইতেও মানুষ প্রধানমন্ত্রীর মাঝে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
এবার হয়থ শেখ হাসিনার মাঝেও নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে চাইবে। সম্ভবত: তাতে দেশ ও দশের মঙ্গল। শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত চমৎকার সংগ্রাম করছে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে অন্যরা, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে শেখ হাসিনা ধীর, স্থীর, অবিচল। ভোটেই এবার আওয়ামীলীগ জয় হবে। অনেকের সাথে একমত হলে দোষ নেই। আওয়ামীলীগ এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। দেশের সুবিধামহল চায় অনেককে নিয়ে আন্দোলন করলেও সরকার আওয়ামীলীগ একাই গঠন করুক। শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যমতের কথা ঐক্যমতে ভিত্তিতে চিরতরে সমাধান চায়। হওয়ার দরকার। স্মরণ রাখা দরকার ক্ষমতায় যাওয়া আওয়ামীলীগের জন্য যত কঠিন, ক্ষমতায় টিকে থাকা হবে তার চেয়েও কঠিন। কেন না মোনায়েমের প্রশাসন নিয়ে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত থমকে গেছেন। কেননা গত ২০ বছর ধরে জিয়া, এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রশাসন নিয়ে আওয়ামী সরকার মুখ থুবড়ে পড়তে চাইবে।
আওয়ামীলীগ জিতবে, কারণ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব সময়োচিত কথাবার্তা, তত্ত্বাবধায়খ সরকার নির্বাচনের ফলে আওয়ামীলীগ তার দুই প্রতিপক্ষকে অনেকাংশে নমনীয় করতে সক্ষম হয়েছে। শত্রুতার বদলে অর্জিত হয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থাত, সেটা বিরাট সফলতা আসন্ন নির্বাচনে এরা একে অন্যের প্রতি কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে পারে না বরং এদের কর্মীগণ পরস্পরের প্রতি অনেকটা নমনীয়।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সকল ষড়যন্ত্র জনগণের কাছে ধরা পড়ে গেছে। সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আওয়ামীলীগ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে। অতীতে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে, এবারও সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে শেখ হাসিনার নৌকা এগিয়ে যাবে। জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টিকতে পারবে না, পারেনি। এবারও যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তা ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে এই ষড়যন্ত্র টিকবে না। হাসিনা বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীল আন্দোলন চালিয়ে যাবে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মত তেমনি নির্ভীক নি:স্বার্থ নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
