জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৮৭

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন) :
(গত পর্বের পর) : আমার বিবাহ : উনি ‘‘স্বামী’’ আবার সকালে এলেন। আবার তার জন্য নতুন করে খাশি জবাই করা হল। পোলাও, কোরমা, জরদা হল। নতুন জামাই বাড়ীর সকলেই তার যতেœর জন্য অস্থির, উনি বৈঠকখানা ঘরেই আছেন। সেখানে আমার ছোট দুই ভাই কুট্রি ও মনু। ওদের চকলেট লজেন্স খাইয়ে খুব তাড়াতাড়ি বশ করে ফেললেন ওদের দুলাভাই। ওরা বড় দুলাভাই বড় দুলাভাই করে অস্থির। আমাদের থাকার ঘরের বারান্দায় তার খাবার আসন পড়ল দামী সাদা ধব ধবে শীতল পাটি বিছিয়ে নকশা কাটা দস্তর খান বিছিয়ে দামী বড় বড় কোরমা দানে কোরমা নিয়ে ডিশে পোলাও নিয়ে আমার দুই ভাই সাথে খাওয়ার ডাক পড়ল। তিনি এলেন খেতে বসলেন। বাবাও তার সাথে খেতে বসলেন। আমার ছোট বোনের স্বামীও খেতে এলেন। দুই জামাই নিয়ে হাসি গল্পে বাবার যেন আনন্দ আর ধরে না। সে দিন যেন পৃথিবীতে বাবার মত সুখী আর কেউ ছিল না। বাবার জীবনের চরম পাওয়া। বাবা যা চেয়েছিলেন বিধি যেন দু’হাত ভরে তাকে তা দিয়েছেন।
বাবা দু’জামাইকে এটা খাও, ওটা খাও, আর একটু খাও, কই তোমরা কিছুই খেলে না, বলছিল। বাবা ভেবেছিলেন, বিয়ে হয়ে গেছে জামাই এখন ঢাকা চলে যাবে। আগেই ছেলের চাচার সাথে কথা হয়েছে। বাবা বলেছেন মেয়ে আমার খুব ছোট। তিন বছর দেরী করতে হবে। এখন রোসমত হবে না। ছেলের চাচা বলেছেন, ছেলে এখন তিন বছর বাইরে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এখন আমার স্বামী সকালে তাদের বাড়ী গেলে বিকালে আমাদের বাসায় চলে আসেন। বাবাও মাকে জামাইর আদর যতেœ থাকতে হয়। এরি মধ্যে আমার স্বামী আমাকে ছোট করে এক টুকরো চিঠি দিয়েছিলেন। আমি লাইব্রেরী রুমের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলে সে আমাকে একটি আংটি পড়িয়ে দেবে। আমি সেই চিঠি আমার ছোট ভাইর হাত থেকে পেয়ে রীতি মত কাঁপতে আরম্ভ করলাম। চিঠিখানা সাহস করে মা’র হাতে দিলাম।
মা বাবাকে দেখাল। বাবা মাকে বললেন, জামাই তখন বলছে, মেয়ে ছোট সে তিন বছর প্রতিক্ষা করবে আর কাল বিয়ে হল আজই মেয়েকে চিঠি পাঠাচ্ছে আংটি পড়িয়ে দিবে। কি ব্যাপার তাদের কথার দাম থাকল কই?
বাবা ও মা এ চিঠির জবাব না দিয়ে আমার ছোট ভাইকে দিয়ে বলে দিল, আংটি তোর কাছেই দিতে বল। বাবা খুব তাড়া দিতে লাগলেন, রশীদ মিয়া তুমি তাড়াতাড়ি ঢাকা চলে যাও। সামনে তোমার বি.সি.এস পরীক্ষা আবার ল ক্লাসে এডমিশন নিয়ে ফেল। বাবার তাড়া খেয়ে উনি গিয়ে সলিমুল্লা মুসলিম হলে সিট নিলেন। সেখানে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে আমাকে চিঠি দিতে তার ভুল হয়নি।
বাবা একদিন কোর্টে গিয়ে উপরের ঠিকানা না দেখে চিঠি খুলেই ফেললেন। পরে বুঝতে পারছেন যে, চিঠিটি আমাকে লেখা। বাসায় এসে চুপে চুপে মাকে নিভৃতে ডেকে বললেন, তবুকে বল আমি বুঝতে পারিনি যে, জামাই ওকে চিঠি দিয়েছে। আমি আমার চিঠি মনে করে খুলে ছেলেছি। তবু যেন কিছু মনে না করে। আমার তখন উনার চিঠির উপর কোন আগ্রহই ছিল না। তার কথা আমার তেমন প্রবলভাবে মনেই হত না। সবাই বলে আমার বিয়ে হয়েছে এই পর্যন্তই। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে প্রবল আবেগে আবেশ ভাষায় দীর্ঘ দীর্ঘ চিঠি ঢাকা থেকে আসছে।
চিঠির ভাষা-
আমার ছোট্ট বউ, আমার মন মন্দিরের মানস প্রতিমা। এ সব ভাষা বুঝবার মত মন আমার তখন হয়নি বা এ সব প্রেমের আভাস আমার মনকে তখন আন্দোলিত করে নি। আমারও কচি কিশোরী মনে তেমন প্রভাব ফেলে নি। প্রায় দীর্ঘ দু’মাস পর্যন্ত চিঠি আসছেই। আমার থেকে কোন সাড়া শব্দ নেই। চিঠি পেলে আমি পড়ি আর হাসি। লোকটি ভারি অসভ্য আমাকে কি সব লিখছে। বাবা একদিন আমাকে সন্ধ্যাবেলা ডেকে পাঠালেন, জামাই যে তোকে এতগুলো চিঠি লিখেছে তুই কি তার দু’একটির উত্তর দিয়েছিস? আমি বললাম, বাবা, লোকটা ভাল না, ভারি অসভ্য। আমাকে যা তা লিখে।
বাবা বললেন, এখন আমার কাছে বসে উত্তর লিখে পাঠা। আমি বললাম, বাবা আমি ওনার কাছে চিঠি লিখতে জানি না। বাবা বললেন, আমি বলে দিচ্ছি তুই লিখে দে। আমি কি লিখব।
প্রিয়তম, আমার ভালবাসা নিও। তোমার পর পর অনেক চিঠি পেয়ে খুশি হয়েছি। মাঝে মধ্যে চিঠি দিও।
তারপর লিখ যে, তোমার ভিখারিণী দাসী তবু। আমি বললাম বাবা, আমার প্রাণ থাকতে আমি এ কথা লিখতে পারব না। দাসী তো বান্দি, তাহলে কি আমি আমার স্বামীর চাকরাণী? বাবা বললেন, স্ত্রীরা চিরকালই স্বামীর চাকরাণী হয়। আমি এই কথা শুনে চিঠি ছিড়ে দৌড়ে চলে গেলাম। বাবা আমার পিছু পিছু গিয়ে আমাকে অনুনয় বিনয় করে ডেকে এনে চিঠি লিখালেন আর লিখে দে, তোমার তবু।
তোমার তবু আমি কথাটা সহজেই মেনে নিলাম। বাবা বললেন, তোর মাও আমাকে চিঠি দিতেন তাতে তোর মাও আমাকে লিখেছে তোমার চির ভিখারীনী দাসী। আর তোরা এ যুগের মেয়েরা দাসী শব্দ শুনলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে রাখিস। বললাম বাবা দাসী হতে যাব কেন? আপনি, বা মা যা পছন্দ করতেন, আমার তো তা না-ও পছন্দ পতে পারে। তারপর থেকে আমার নামে অনেক চিঠি এসেছে। আমি আর বাবার শরণাপন্ন হইনি। নিজেই বুদ্ধি করে গুছিয়ে ম্যানেজ করতাম। চিঠির উত্তর দিতাম।
(চলবে—–)।
