ভেদুরিয়ায় অসময়ে তেঁতুলিয়ার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ী, জমি-জমা

নদীতে তিনবার ভাঙা দিছে, এখন আবারো ভাঙনের মুখে রয়েছি, এই ঘরটাও যেকোনো সময় নাই হয়ে যাব। আমরা গরিব মানুষ, কোথায় যাবো কোথায় আশ্রয় নেব, কোথায় নতুন করে ঘর তুলবো বলতে পারছি না। চোখমুখে দুশ্চিন্তায় ছাপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়ার আমেনা বেগম।
তেঁতুলিয়া পাড়েই বসবাস নিলুফা বেগমের। নদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, এক সময় আমাদের বাড়ি চটকিমারা এলাকায় ছিলো, গত কয়েক বছরে ভাঙতে ভাঙতে এখন এখানে বসতি তুলেছি। পাঁচ বার নদীতে ভাঙার পর এখন আবার ভাঙনের মুখে পড়েছি। ভাঙনের কারণে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। স্বামী মাছ ধরার কাজ করে, পাঁচ ছেলে-মেয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। শুধু আমেনা ও নিলুফা বেগম নয়, তাদের মত এমন অবস্থা এখন অনেকের। তেঁতুলিয়ার ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলের বিপন্ন মানুষ।
ভোলা সদরের ভেদুরিয়া ইউনিয়নের মধ্য ও উত্তর ভেদুরিয়া নামে দুটি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা তেঁতুলিয়ার ভয়ানক ভাঙনের মুখে পড়েছে। বসতঘর ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত বর্ষায় অনেকেই গৃহহারা হয়েছেন। এখন শীত মৌসুমেও চলছে ভাঙন। এতে শতাধিক বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অন্যত্র ঘর সরিয়ে নেওয়ার সময়ও পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন আতঙ্কগ্রস্ত। ভাঙনের মুখে পড়ে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে ভেদুরিয়া।
ভাঙনের শিকার ফজলু মাতাব্বর জানান, বর্ষার সময় এখনকার অনেক ঘর-বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। অনেকেই ভেবেছিলো শীত মৌসুমে ভাঙন বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু শীতেও চলছে ভাঙন। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় ঘর-বাড়ি, গাছপালা তুলে নিতেও পারছে না কেউ কেউ।


তেঁতুলিয়া পাড়ের মধ্য ভেদুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাসেম বলেন, এখন পর্যন্ত ২০০ ঘরবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাদের মত আমরাও ভাঙনের শিকার হয়েছি, দ্রুত বাঁধ না দিলে আমরা এখানে বসবাস করতে পারবো না’। ইসমাইল মোল্লা বলেন, সহায় সম্বল বলতে আমাদের ঘরটুকু রয়েছে তাও ভাঙনের মুখে।
সম্প্রতি সরেজমনি গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভেদুরিয়া ইউনিয়নের লঞ্চঘাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া পাড়ে উত্তর ভেদুরিয়া ও মধ্য ভেদুরিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের মুখে। ফসলের ক্ষেত, ঘরবাড়ি ও গাছ-পালাসহ বিস্তীর্ণ জনপদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় এলাকার মানুষ।
এ ব্যাপারে ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল বাশার বলেন, তেঁতুলিয়ার ভাঙনে আমরা দিশেহারা। বর্ষা মৌসূম ছাড়া প্রতিনিয়ত-ই ভাঙছে। এ ভাঙনের ফলে বসত ঘর, ভিটে-মাটি হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এতে করে সীমাহিন দুর্ভোগের মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে অনেক পরিবার।
ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান নলি বলেন, আমার এলাকার অনেক মানুষ তেঁতুলিয়ার ভাঙনে ভিটে-মাটি হারা। মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার্থে স্থায়ীভাবে ব্লক এর ব্যবস্থা না করা হলে এই ইউনিয়নটি অচিরেই ছোট হয়ে যাবে। তাই দ্রুত স্থায়ী ব্লক বাধের মাধ্যমে রক্ষা করা জরুরী। আমি এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।
এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান তাজল ইসলাম মাস্টার বলেন, বর্ষা মৌসূম-এও তো ভাঙেই, কিন্তু এখন শীত মৌসূমেও ভাঙছে। এ ভাঙন থেকে ভেদুরিয়া গ্যাস ফিল্ড, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ ভেদুরিয়াবাসীকে রক্ষার জন্য ভোলার অভিভাবক তোফায়েল আহমেদ এমপির সাথে কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাবুল আক্তার বলেন, তেঁতুলিয়া নদীতে যে পয়েন্ট দিয়ে ভাঙন চলছে ওই পয়েন্টে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তবনা দেওয়া হয়েছে। এখন ওই এলাকায় সমীক্ষার কাজ চলছে। সমীক্ষা শেষ হলেই আশাকরি খুব শিগগিরই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।