ভূমি মালিকগণ মামলার রায় পেলেও দখল বুঝে পায়নি

ভোলার ৮ মৌজায় ৭শত একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে

(ফাইল ছবি)

ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা চর আনন্দ মৌজা পার্ট-১, ২, ৩ সহ ৮টি মৌজার প্রায় ৭শ’ একর ভূমি প্রভাবশালী মহলের দখলে। প্রকৃত ভূমি মালিকগণ মামলার রায় পেয়েও দখল বুঝে পায়নি।
সরে জমিন ঘুরে জানা যায়, ভোলা সদর উপজেলায় ইলিশা চর আনন্দ মৌজা পার্ট-১, ২, ৩ সহ ৮টি মৌজার প্রায় ৭শ’ একর ভূমি স্থানীয় প্রভাবশালী আবু তাহের উকিল গং, মোঃ বাবুল, মোঃ বশির, মোঃ আলাউদ্দিন গংদের লাঠিয়াল বাহিনী দ্বারা লুট-পাঠ হামলা-মামলা দিয়ে নিরীহ ভূমি মালিকদের দূরে সরিয়ে জবর দখলের মাধ্যমে ভোগ দখল করে আসছে। আদালতের রায় অমান্য করে রাধা মধাব পালের প্রজাদের উৎখাত করার জন্য দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জোর-জুলুম চালিয়ে ভোগ দখল করে আসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চর আনন্দ মৌজার ১৪২ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে ভোলার মোকাম বিজ্ঞ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা রুজু করা হয়। যার নং-৩৫/২০২০, তাং-২৫/০৯/২০২০। মামলা সূত্রে জানা গেছে, গোলী বল্লব পাল ২৩/১১/১৯৭৬ ইং তারিখে মৃত্যু বরণ করায় প্রবেটভূক্ত সকল সম্পত্তিতে তাহার একমাত্র পুত্র অনিল কৃষ্ণ পাল স্বত্ববান হন। অনিল কৃষ্ণ পালে মৃত্যুর পর ওয়ারিস সূত্রে তার ২ পুত্র শিব শংকর পাল ও সনাতন পাল ভূমির মালিক হন। ১৯৭২ সালে একটি কুচক্রী মহল রাতারাতি সরকার কর্তৃক ভূয়া কার্ড করে নেয়, কিন্তু রের্কডীয় ভূমি মালিকানার কারণে উক্ত কার্ড অকার্যকর হয়ে যায়।
তৎকালীন ভোলার সিও রেভিনিউ সার্কেল অফিসার মিস্টার জেসি পন্ডিত উক্ত ভূমির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় যে, তৎকালীন সরকারী কর্মকর্তাগণ বে-আইনীভাবে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ১ দিনেই ভূমি বন্দোবস্ত করে, সেই দিনেই তা অনুমোদন করেন। উল্লেখ্য যে, সে দিন কোনো অফিসার অফিসে ছিলেন না। ঐদিন বিগত ২০/০৪/১৯৭৩ইং তারিখে তৎকালীন কানুনগো উপস্থিত ছিলেন। ঐ তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ্য করেন যে, জনৈক মফিজুল হক পরিবারের ৩ পুরুষের সদস্য ছেলে মেয়ে, চাকর, গৃহশিক্ষক ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের নামে স্ব-নামে ও বে-নামে বন্দোবস্ত নেয়। ভূমি বন্দোবস্ত দেয়ার পর যখন আবার বাতিল করা হয় তখন উক্ত উক্ত পরিবারের সদস্যগণ রেকর্ডীয় ভূমি মালিকগণের সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন।
তদন্তে বলা হয় সরকার নিলাম খরিদ মূলে কোন সম্পত্তি অর্জন করেননি। সরকারের নিলামের কোনো বহায়নাম, দখলনামা গ্রহণ কারা হয়নি। উল্লেখ্য, ভোলায় একটি খ্যাত উচ্চশিক্ষিত প্রভাবশালী পরিবারের ক্ষমতার প্রকব খাটিয়ে প্রকৃত ভূমি মালিকদের রেকর্ডীয় সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। সরকার কার্ডধারী প্রজাদের বন্দোবস্ত কাউকেই প্রদান করেন নাই। তৎকালীন কানুনগো’র দায়িত্বে ছিলেন অঘোর চন্দ্র দেবনাথ। কিন্তু তিনি তদন্ত করার পরও ভূমি কার্ডধারীদের উক্ত জমি বুঝিয়ে দেননি। যেহেতু সরকারের নিলাম খরিদ আইন সংগতভাবে হয়নি এবং ভূমির মূল মালিকদের কোন সম্পত্তি কথিত নিলামের মাধ্যমে মালিকানা অর্জন করেননি, নিলাম মূলে সরকারের নালিশী ১১৯ নং জোতে কোনো শর্ত অর্জিত হয়নি। এছাড়া সহবাদীদের পত্তন গ্রহণ আদৌ প্রামানিত হয়নি। যেহেতু আদালত ভূয়া কার্ড বাতিল করেছেন, সেহেতু উপয়ায়ন্তর না পেয়ে রিসিভার থেকেও অবৈধভাবে ক্ষমতার বলে নিয়েছেন। তাছাড়া রেকর্ডীয় সম্পত্তির ফলে সরকার কর্তৃক উক্ত ভূমি লিজ দেয়ার কোন অধিকার রাখে না।
চর আনন্দ মৌজার খতিয়ান নং ১১৯, তৌজি নং ৫৩০৩, কামিনী সুন্দরী জোৎ এর প্রজাগণ জমি-জমা হারিয়ে দিক বিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। পথে বসেছে রেকর্ডীয় ভূমি মালিকগণ। ১৯৮৯ সালে উক্ত রেকর্ডীয় ভূমির রায়কৃত সম্পত্তি ১১২/৮২ মামলার আদেশের অনুকূলে প্রকৃত ভূমি মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
এদিকে দখলদারগণ স্থানীয়দের মাঝে নামে-বেনামে দলিল কিংবা স্ট্যাম্পে লিখিত দিয়ে লাখ লাখ টাকা নিচ্ছেন। ভূমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হতিয়ে নিচ্ছেন। এভাবেই হস্তান্তর করছেন বাড়ি, ভিটা ও পুকুর । অন্যদিকে ঐ জমিতে ফলের বাগান, বৃক্ষরাজী বিভিন্ন রকম শাক সবজী, ধানসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপক অর্থ-সামগ্রী।
ভোলা সদর অধীন পরগনা দক্ষিণ শাহাবাজপুর মৌজার চর আনন্দ মধ্যে রেভিনিউ সার্ভে নং ৩৫৫২ এবং ৬৩০৩নং তৌজিভূক্ত পি,এস-১১৯ নং খতিয়ানে ৩শ’ ২৪.৪৯ একর, দাগ নং ১৮৯/২১৯/৩৫০/৯০(১৮৯/৫৩৮), ২০৭/৫৭৭। ২নং খতিয়ানে ৫৬.৯১ একর, যার দাগ নং ৩৩৬/৪২৪/৪২৮/৪৭১/৪৭৭/৩২৩/৩০০/৩০৪, খতিয়ান নং ৩ এর ১৮.৭৯ একর। ৫নং খতিয়ান-১৪৮.৬৫ একর, ৫২নং খতিয়ানে ৪.৭৭ একর, ৯৭নং খতিয়ানে ৫.২৬ একর সহ আরো খতিয়ান রয়েছে।
একজনের নামে থাকা জমি ১২ বছর ধরে অন্যজনের ভোগ দখলে থাকলেই সেই জমি তার হয়ে যাবে, এমন আইন পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দখলদার যাতে জমির মালিক না হয়ে যায়, সে জন্য ভূমি ব্যবহার সত্ত্ব গ্রহণ আইন-২০২০ নামে নতুন আইন করা হচ্ছে। ভূমির ব্যবহার সত্ত্ব গ্রহণ আইন-২০২০ খসড়া চূড়ান্ত। বর্তমানে আদালতে বিভিন্ন মামলার মধ্যে ৭০ ভাগ মামলাই জমি-জমা সংক্রান্ত। যার বেশিরভাগই জমি দখল বিষয়ক মামলা। আর এসব মামলা চলতে থাকে বছরের পর বছর কিংবা যুগ যুগ ধরে। নিষ্পত্তি হওয়ার হারও তেমন বেশি নয়। দেশে ভূমি ভোগ দখল সংক্রান্ত যে আইন রয়েছে তা ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৫ সালে প্রনয়ন করা হয়েছিল।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক আইনের পরিবর্তন হলেও এ আইন পূর্বের মত রয়েছে। এতে কারো জমি অন্যজন ১২ বছর ভোগ দখল করলে সেই জমির মালিকানা পাওয়ার সুযোগ ছিল।
মুল রেকর্ডীয় মালিকের সম্পত্তি ভূমি মালিকগণ পক্ষে আক্তার চৌকিদার, মোঃ জামাল হোসের, সেকান্তর সিকদার, মকবুল আহমদ মুন্সি গং, মোঃ বশির, মোঃ বাবুল, ফারুক সর্দার, মোঃ সামছুদ্দিন, মোঃ হরুন, মোঃ আজিজল, মোঃ আব্দুর রব, মোঃ কামাল, সামছুদ্দিন হাজারী, সামছুদ্দিন বরুয়া, শাহে আলম, হাজী সিরাজ, নূর উদ্দিন গং সহ ১ থেকে ৮৩ ভূমি মালিক তাদের জমি বুঝে পাওয়ার জন্য সরকার বাহাদুর ও জেলা প্রশাসনের নিকট জোর দাবী জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ভূমি দখলদার প্রতিপক্ষ আবু তাহের উকিলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমরা চর আনন্দ পার্ট-১, ২, ৩ এর ১৯৪৫ সালে বন্দোবস্ত নেই। ওই জমি বন্দোবস্ত নিয়ে ভোগ দখলে আছি। বন্দোবস্ত সূত্রে ভূমি আরএস, এসএ রেকর্ড হয়নি। সে কারণে আদালতে মামলা করে সলে সূত্রে ডিক্রি পাই এবং নামজারি করে খতিয়ান খুলেছি।
ভোলা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবি আবদুল্লাহ খান এ ব্যাপারে জানান, চর আনন্দ পার্ট-১, ২, ৩ এর জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান আছে। মামলার রায় অনুযায়ী জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেয়া হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।